বিদায় স্বায়ত্তশাসন ও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা?
গত ৫ জুন ২০০৮-এ বাংলাদেশের প্রধান সারির সংবাদপত্র প্রথম আলোতে কামাল হোসেনের একটি লেখা একটি প্রতিষ্ঠানের পুনর্জীবন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ ছাপা হয়েছে। লেখাটিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা যখন জাতীয় ঐক্য ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাইছি, আমরা যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় বিশ্বাসী, তাঁদের কি উচিত নয় এর পুনর্গঠনের জন্য হাতে হাত রেখে ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ সংশোধন করার ব্যাপারে একমত হওয়া?’
এককথায় তাঁর অভিমত হলো, ১৯৭৩-এর স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশটি জাতীয় স্বার্থে সংশোধন করা হোক।
প্রায় একই সময় দৈনিক ভোরের কাগজে খবর বের হয়, বাংলাদেশের ৩০টি উপজেলার সরকারি-বেসরকারি সব কটি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখভালের দায়িত্ব গোপনে গত মার্চ মাসের পাঁচ তারিখে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ-ঘটনা স্পষ্টতই প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বেসরকারি করে ফেলার প্রাথমিক পদক্ষেপ। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষকরা এ ব্যাপারে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভোরের কাগজের খবর অনুযায়ী, ব্র্যাকের কর্মকর্তারা প্রাথমিক শিক্ষকদের সংগঠনকে আলোচনায় আসার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ প্রস্তাব শিক্ষকদের সংগঠনগুলি প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্র্যাকের এই অতিউৎসাহ থেকেও বোঝা যাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে তাদের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। তা ছাড়া ফজলে হোসেন আবেদও বলে দিয়েছেন, উপ-আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম যেহেতু তারা পরিচালনা করতে পারছেন, সেহেতু প্রাথমিক শিক্ষার কাজটিও তারা অনায়াসে চালিয়ে নিতে পারবেন।
সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রথমে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি কলাম ছাপা হয়েছে, যাতে তিনি নম্র ভাষায় সরকারের এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। পরে গত ০১ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফি আহমেদ আবার ব্র্যাকের পক্ষ নিয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের বক্তব্যের বিরোধিতা করে একটি কলাম লিখেছেন। তিনি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে সরকারি পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
তার মানে আমরা এখন এই প্রশ্নের মুখোমুখি: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন আর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা থাকবে কি থাকবে না? কামাল হোসেন, যিনি ডক্টর কামাল হোসেন হিসেবেই সাধারণ্যে পরিচিত এবং নামের আগে ডক্টর পদটি না থাকলে যাঁকে অনেকেই পৃথিবীর তাবৎ সাধারণ কামাল হোসেনের তালিকায় ফেলে দেন,- তাঁর কাছ থেকে লিখিতভাবে, তাও আবার বাংলা ভাষায়, কোনও অভিমত পাওয়া সত্যিই বিরল এক সৌভাগ্যের ব্যাপার। বিরল এ-লেখাটি আবার এমন এক প্রসঙ্গে লেখা যেটি ভীষণ স্পর্শকাতর। ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসন জারি করার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩কে বাতিল করার, কখনও বা সংস্কারের নামে অকার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত আর কুলাতে পারেন নি।
অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারী করার উদ্যোগও বাংলাদেশে এই প্রথম নয়। ১৯৮১ সালেও বিএনপির শাসনামলে সংসদে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বেসরকারি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকদের আন্দোলনে সরকার বাধ্য হয় সে সিদ্ধান্ত ত্যাগ করতে।
বাজার-মৌলবাদের দাবি : সবকিছু করা হোক বেসরকারি
ড. কামাল হোসেন কেন হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে পুরানো সেই ‘বাণীচিরন্তন’ লিখতে গেলেন? কেন তিনি মনে করছেন, স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাপরিস্থিতিতে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে? সত্যিই কি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতির জন্যে ¯^vqËkvmb অধ্যাদেশ ১৯৭৩-ই দায়ী?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্যে কামাল হোসেনের এই বাক্যগুলি আমাদের সাহায্য করতে পারে, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নতুন ধরণের নীতিবর্জিত সহিংস ঘটনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের উৎস থেকে একে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক উপদলের সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার সঙ্গে জ্ঞান ও সত্যসন্ধানের কোনো সম্পর্ক নেই।’ একটি নষ্ট উদ্দেশ্যকে সাধন করার জন্যে আরেকটি নষ্ট ছুঁতো খুঁজে পেতে হয়। কামাল হোসেন সেরকম বিভিন্ন ছুঁতো খুঁজে পেতে চেয়েছেন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলির নীতিবর্জিত সহিংস ঘটনার মধ্যে।
যত নষ্টের গোড়া ১৯৭৩-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ,- এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েই কামাল হোসেন এ লেখায় এসব ছুঁতো খুঁজে বের করেছেন। তিনি লিখেছেন, এই অধ্যাদেশটির খসড়া কপি শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে তুলে দেয়ার সময় শেখ মুজিব নাকি তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমার কি মনে হয়, এত নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নির্বাচিত কার্যালয় হজম করার মতো ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে?’ আমরা জানি না, শেখ মুজিব নিহত হওয়ার এত বছর পর কেন কামাল হোসেনের এই ‘অমিয়বাণী’ মনে পড়ল। আমরা জানি না, কেন তাঁর এতদিন পর মনে হচ্ছে, ‘‘বঙ্গবন্ধু সঠিক অবস্থানে ছিলেন। এত এত নির্বাচন কেবল বদহজমই ঘটায়নি; বরং স্বার্থপর ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যে দিয়ে তা খাদ্যে বিষক্রিয়ার রূপ নিয়েছে।’ সামরিক জান্তা এরশাদবিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনের সময় একবারও তাঁর এ আত্মোপলব্ধি ঘটেনি, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটিকে সবচেয়ে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করার কাজটি ওই সময়েই সম্পন্ন হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে তিনি যখন শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গণফোরামের পক্ষ থেকে এক সমাবেশ করেন এবং এসংক্রান্ত একটি সমীক্ষাসংকলন ছাপিয়ে ও বিলি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হানাহানির তত্ত্বতালাশ করেন, তখনও তিনি ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশের দোষ খুঁজে পাননি। এতদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন হানাহানি অনেকটাই কমে এসেছে, ছাত্র-শিক্ষকরাও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শিক্ষার পরিবেশকে দলবাজী থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে অনেক সচেতন সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, তখন তিনি হঠাৎ অধ্যাদেশটি পরিবর্তনের ‘বাণীচিরন্তন’ প্রচার করতে নেমেছেন। এর লক্ষ্য কি শুধুই ‘বিদ্যাশিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের সর্বস্বীকৃত কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় আগে যা শ্রদ্ধা পেত তা ফিরিয়ে আনা?’
না, আসলে তা নয়। এর শেষ লক্ষ্য হচ্ছে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের প্রক্রিয়া চালু করার নামে অগণতান্ত্রিক একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া, এই প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ছকেবাঁধা সৃজনবিমুখ, প্রশ্নহীন, আনুগত্যশীল শিক্ষার ধারা সক্রিয় করা, উচ্চ ও মানসম্মত শিক্ষা সবসময়েই ব্যয়বহুল,- এরকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে উচ্চশিক্ষার পথ সংকুচিত করা, ক্রমান্বয়ে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যক্তিখাতে তুলে দেয়া, বেসরকারি করা,- কেননা বাজার-মৌলবাদ এরকমই প্রত্যাশা করে পুঁজিশাসিত একটি সমাজ-রাষ্ট্রের কাছ থেকে, কেননা কর্পোরেটতন্ত্র এরকমই প্রত্যাশা করে রাষ্ট্রের সরকারের কাছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন : ধ্রুপদী অভিজ্ঞতা
কামাল হোসেন লিখেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশটি ছিল ষাটের দশকের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া।’ কিন্তু এটি কি কেবলই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা বিকাশের ধারাবাহিক ইতিবাচক অভিজ্ঞতাই ছিল এ অধ্যাদেশের মূল পাথেয়? কামাল হোসেন সত্যকে গোপন করতে চেয়েছেন, নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার অতীত ধারাবাহিকতার দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত রাখার চিন্তা শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক দশকের মধ্যেই। এবং এ-চিন্তার শুরু ইতিবাচক বিবেচনা থেকেই।
ভারত উপমহাদেশে যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু হয় এবং পরে ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কতটুকু মূল্য পাবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রচলনের পেছনে বিভিন্ন মহলের বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছিল। কিন্তু তারপরও শিক্ষার সার্বজনীনতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই মৌলিক বিষয় হয়ে ওঠে। এসময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বক্তব্য রাখার সময় একজন ইংরেজ উপাচার্য এমন এক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করেছিলেন, ‘যখন শিক্ষা এমন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হবে, তা এমনি সাধারণ অর্জনের বিষয় হয়ে পড়বে যে, এ আর অসাধারণ বলে গণ্য হবে না, যার ফলে শিক্ষা কোনো বিশেষ দাবি বা ব্যক্তির কোনো অভিযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে উচ্চশিক্ষার তেমন বিস্তারই হবে আমাদের শান্ত কামনা।’
ব্রিটিশরাজের নিয়োজিত উপাচার্যের পক্ষ থেকে এরকম শান্ত কামনা জানানোর পরও ব্রিটিশ শাসকচক্র বার বার উদ্বিগ্ন হয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছে। কেননা তাদের মনে হয়েছে, স্বাধীন শিক্ষার সংস্পর্শে আসার মধ্যে দিয়ে এমন সব দাবি অনিবার্যভাবেই উঠে আসছে যেগুলোর চরিত্র রাজনৈতিক। রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চেয়েছে তারা। আর এ-ব্যাপারেও মুখ খুলতে হয়েছে উপাচার্যদের। ১৮৯৩ সালে একজন ইংরেজ উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যদের রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে উৎসাহিত করাতে আপত্তি সম্পর্কে আমার একটি চতুর সন্দেহ আছে, সেটি এই যে আমরা যেহেতু যাই করি বা না করি না কেন তাদেরকে নিবৃত্ত করতে পারবো না তাই রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে নিজেদেরকে অভিব্যক্তি করার বৈধ সুযোগ করে দেওয়াই সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত ভূমিকা এবং স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দ্বন্দ্ববিরোধ বিকশিত ও পরিশীলিত হতে হতে ধারাবাহিকভাবে যে-সত্যে উপনীত হয় সে-সত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে। পরপর দু’বার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীরা হবে অনুগত, কর্তৃপক্ষের প্রতি দায়বদ্ধ, সরকারের কাছে অবনত,- এরকম সব ধারণা পোষণ করতেন তিনি প্রথম দিকে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তিনি এই জ্ঞানে উপনীত হন,- কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারে না, মুক্ত চিন্তাকে উৎসাহিত করতে পারে না।
১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্যার আশুতোষ বলেছিলেন, ‘আইনসম্মত কর্তৃপক্ষের প্রতি সেই আনুগত্যের বোধ প্রদর্শন করো যা সত্যিকারের শিক্ষাগত শৃঙ্ক্ষলার অপরিহার্য অঙ্গ। …নিজেদেরকে অনুগত ও মূল্যবান নাগরিক হিসাবে প্রমাণ করো। পৃথিবীকে দেখিয়ে দাও যে, শিক্ষা ও আনুগত্য কেবল পরষ্পর সঙ্গতিপূর্ণ হবে তা নয়, বরঞ্চ যতই শিক্ষা এগোবে, যতই বিশুদ্ধ হবে সংস্কৃতি, ততই গভীরে হবে শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক।’
পরের বছর ১৯০৯ সালে সমাবর্তন ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সর্বপ্রকারে, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে আমাদের যুবকদেরকে তাদের হাত থেকে বাঁচাতে যারা দায়িত্বজ্ঞানহীন, ছাত্রদের বিভ্রান্ত করতে চায় এবং আইনসঙ্গত সরকারের বিরুদ্ধে কচি মনকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করে।’
তারপর ১৯১০ সালের সমাবর্তন ভাষণে তিনি বলেন, ‘এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে কোনো কোনো শিক্ষক ও অধ্যাপক- ছাত্রদের পড়ানোর মতো প্রস্তুতি ও যোগ্যতা যাঁদের আছে – তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত আস্থার অপমান করছেন।’
কিন্তু স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এই সত্যের দিকে এগিয়ে গেলেন, অনুগত শিক্ষার্থীরা কখনও সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে না, নতুন চিন্তার জন্ম দিতে পারে না, নিজেদের বিকশিত করতে পারে না, প্রকৃত শিক্ষায় অবগাহন করতে পারে না। তিনি দেখতে পেলেন, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্যে এরকম সব অনুগত ডিগ্রিধারীরই জন্ম দিতে চাইছে ব্রিটিশরাজ ও সরকার।
১৯২১ সালে দ্বিতীয় দফায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। অসহযোগ আন্দোলন চলছে তখন। তিনি দেখতে পেলেন, সরকার চায় বিশবিদ্যালয়কে আরও প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে। ১৯২৩-এর সমাবর্তনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই সমস্যার দিকেই মুখ তুলে কথা বললেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্বাধীনতা হলো শোণিত-ধারা, বিকাশের শর্ত, সাফল্যের রহস্য।’
আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আরও বললেন, ‘জেনে রাখুন, আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবমাননায় অংশ নেবো না। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছুতেই গোলাম সৃষ্টির কারখানায় পরিণত হতে দেওয়া হবে না। আমরা যথার্থরূপে চিন্তা করতে চাই। আমরা স্বাধীনতা শিক্ষা দিতে চাই।’
এটিই ছিল স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শেষ সমাবর্তন ভাষণ। পরের বছর ১৯২৪ সালে মারা যান তিনি। কিন্তু মৃত্যুর আগে আরও একটি দৃষ্টান্তজনক ও সুদূরপ্রসারী ঘটনার জন্ম দেন তিনি। বাংলার তৎকালীন গভর্নর লিটন এ-সময় তাঁকে এক চিঠিতে লেখেন, একটি কাজ করে দিলে তিনি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে আবারও উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন,- কাজটি হলো, বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করার জন্যে ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। লিটনের এই চিঠির উত্তরে, এই প্রস্তাবকে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় যে-চিঠি লিখেছিলেন, সেটি এখন পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনসংক্রান্ত ইতিহাসের অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত।
অধ্যাদেশ বদলালেই সব পাল্টে যাবে?
প্রায় একশ বছর আগে এই আত্মোপলব্ধি ঘটেছিল স্যার আশুতোষের জীবনে। কামাল হোসেনের জীবনেও একই ঘটনা ঘটল, তবে উল্টোভাবে। আশুতোষ হেঁটেছিলেন সামনের দিকে, কামাল হোসেন হাঁটলেন পেছনের দিকে। যদিও কামাল হোসেন ভালো করেই জানেন, দীর্ঘদিনের ˆ¯^ivPvix সামরিক শাসন এদেশের শিক্ষাকাঠামোকেও অন্যায়-অভ্যস্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত, অবনত ও বিকৃত করে ফেলেছে; জানেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামধারী দলগুলোও তাদের শাসনামলে আলাদা কোনও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি।
এইসব একই চিত্র বার বার বর্ণনা করার কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতিমুক্ত করা? এর সমাধান কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসনমুক্ত করা? এর সমাধান কি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনপদ্ধতি তুলে দেয়া? ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চয়ই কোনও ধর্মগ্রন্থ নয় যে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-নির্বাচনপদ্ধতি স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশে রয়েছে, তাকে আরও গণতান্ত্রিক করার বদলে অগণতান্ত্রিক করে তোলা কি সমাধানের পথ? কামাল হোসেন তো দেখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সমস্ত রকম নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পরও অতীতের সামরিক জান্তারা, বহুদলীয় শাসনের ছদ্দাবরণে বসবাসরত স্বৈরশাসকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাদেশকে বাতিল করতে চেয়েছে। কেন চেয়েছে? নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করার পরও কেন তাদের মনে হয়েছে এটি একটি বড় হুমকি নিয়ন্ত্রকদের জন্যে? কারণ সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসকদের ভালো করেই জানা আছে, চূড়ান্ত দলীয়করণের পরও যে-কোনও সময় কঠোর নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল ভেঙে মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ।
একই কথা ছাত্ররাজনীতির বেলাতেও খাটে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বন্ধ করার পথ কি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা? নাকি ছাত্ররাজনীতিকে বিকশিত করেই কেবল সম্ভব শিক্ষাঙ্গনকে সুস্থ ও মুক্তচিন্তা চর্চার উপযোগী করা? গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত মত শুনে আসছি। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর এ-অভিমত কর্পোরেটবাদীদের উপকার করা ছাড়া আর কারও কাজে লাগেনি। যে মানুষটি ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করেন, সে মানুষটিই রাজাকার-আলবদরদের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে জাগ্রত করতে চান,- এর মতো বৈপরীত্য আর কী হতে পারে? এখন, ধরুন, আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী রাতের অন্ধকারে উপাচার্যের আসনে আসীন হয়েছিলেন। সেটি কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশের দোষ? না কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের হস্তক্ষেপের ফল? এই কুখ্যাত আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন তার কারণ কি রাজনৈতিক চেতনা নয়? স্বায়ত্তশাসন ও রাজনীতিকে ত্যাগ করলে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব হবে না হাসান আজিজুল হকদের মতো মুক্ত চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদদের রক্ষা করা, বরং অচিরেই শিক্ষকদের ড. তাহের কিংবা ড. ইউনূসের পরিণতি মেনে নিতে হবে, বার বার আগস্ট ২০০৭-এর মতো কারাগারে যেতে হবে শিক্ষকদের।
আর কামাল হোসেনের মুখে তো শেখ মুজিবের এইসব ‘অমিয়বাণী’ কিছুতেই মানায় না। তিনি কি দেখেননি, শেখ মুজিবুর রহমান একসময় দেশের যাবতীয় অরাজকতা, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে উত্তরণের জন্যে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল চালু করেছিলেন? কামাল হোসেন দাবি করে থাকেন, তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং বিলটি পাশ হওয়ার সময় বিদেশে ছিলেন। যদি তাই হয়, তা হলে এটিও তিনি জানেন, শেখ মুজিবের ওই পদক্ষেপের ফলে শেষমেষ বাংলাদেশে সামরিক শাসন এসেছে, ধর্মজ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার সংবিধানসম্মত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত আমরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মুখটাও দেখতে পারি নি। শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার গলদের জন্যে রাজনীতি ও স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এগুলো ছেঁটে ফেলতে চাইলেও ফলাফল সে-রকমই হবে। গণতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলে শেখ মুজিব এ-রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে পারেননি, রাজনীতি ও স্বায়ত্তশাসনকে ছেটে ফেলে কামাল হোসেনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থিতিশীল করতে পারবেন না। একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে শেখ মুজিব, তারপর একদলীয় শাসনেরই আরেক রূপ সামরিক শাসন চালিয়ে জিয়া ও এরশাদ বাংলাদেশকে পবিত্র করতে পারেননি, রাজনীতি নিষিদ্ধ করে কামাল হোসেনরাও পারবেন না শিক্ষার মানকে উন্নত করতে।
অবশ্য ১১ জানুয়ারির নীরব সামরিক অভ্যুত্থানকে যারা বৈধ মনে করেন, সর্বরোগহর মনে করেন তারা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশের মধ্যেই যাবতীয় দোষ খুঁজে পাবেন তাতে আর সন্দেহ কি!

প্রাথমিক শিক্ষাকে অকার্যকর করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
বাজার-মৌলবাদের খপ্পরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠেলে দেয়ার জন্যে যে-তোড়জোর শুরু হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্র্যাকের তত্ত্বাবধানে তুলে দেয়ার ঘটনাটিও তার একটি উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে গ্রাস করার জন্যে ব্র্যাক জাল ফেলেছে অনেক আগে। তাদের এ লক্ষ্যের পরিপূরক কর্মসূচি হলো উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষাকে কুক্ষিগত করার ক্ষেত্রে ব্র্যাকের শক্তিশালী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল গণসাহায্য সংস্থা। কিন্তু ব্র্যাকের এনজিও-রাজনীতির চক্রে হাসফাঁস খেতে খেতে গণসাহায্য সংস্থা বাধ্য হয়েছে ব্র্যাকের হাতে তাদের দেশব্যাপী শিক্ষা কর্মসূচি তুলে দিতে। এ-কাজে তারা ব্যবহার করেছিল যে-এনজিওটিকে সেই প্রশিকাও এখন মারাত্মক দুর্দশার শিকার। দুষ্ট লোকে বলে, নেপথ্য থেকে এ-ব্যাপারেও ব্র্যাক ভূমিকা রাখছে। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তাদের শিক্ষা কর্মসূচি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিকল্প কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি নি। যেসব শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে, তাদের শিক্ষা দেয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরিয়ে ফেলা হচ্ছে ব্র্যাক স্কুলের বিবিধ সুযোগসুবিধার হাতছানি দেখিয়ে। এরপরও কাজ হয় না দেখে এবার ব্র্যাক চাইছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে চুক্তির ফাঁদে ফেলে কব্জা করে নিতে। কয়েকদিন আগে ফজলে হোসেন আবেদ বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘এটা পারলে (উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা) ওটা (প্রাথমিক শিক্ষা) না পারার কি আছে?’ তার মানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।
সরকার খুব ভালো করেই জানেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সমস্যা কোথায়। তাদের বেতন সামান্য, পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন এমন স্কুল হাতে গোণা যায়। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। আর শিক্ষকসংকট থাকলে স্কুল ছেড়ে গিয়ে তারা প্রশিক্ষণই বা নেবেন কেমন করে? সরকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের সারা বছর ব্যতিব্যস্ত রাখা হয়,- কখনও ভোটারতালিকা তৈরির কাজে, কখনও আদমশুমারির কাজে, কখনও টীকাপ্রদান কর্মসূচিতে, কখনও আবার অমুক-তমুক জরিপের কাজে। আবার অনেক সময় বিতর্কিত সব শিক্ষাকর্মসূচির মাধ্যমে, যেমন শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য, তাদের ঠেলে দেয়া হয় স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে দ্বন্দ্বের দিকে। সরকার প্রচার করে, স্কুলে গেলেই গরিব ছাত্রছাত্রীরা খাদ্য পাবে; কিন্তু এ কর্মসূচির নিয়ম হলো, কেবল অভাবী হলেই চলবে না, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে এবং পরীক্ষায় একটি নির্দিষ্ট গড়মাত্রার নম্বর পায় এমন ছাত্রছাত্রীদেরই খাদ্য দেয়া হবে। গ্রামের ক্ষমতা কাঠামো শিক্ষকদের ওপর যে অপ্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করে, তার ফলে স্কুলের শিক্ষকরা বাধ্য হয় ছাত্র বা ছাত্রটিকে অভাবীর সার্টিফিকেট দিতে, বাধ্য হয় কাগজে-কলমে তাকে উপস্থিত দেখাতে এবং বাধ্য হয় পরীক্ষার সময় ইঙ্গিতময় ভাষায় উত্তর বলে দিতে,- যাতে তারা পরীক্ষার খাতায় গড় মার্কস পেতে পারে (কেননা এই পরীক্ষার খাতা নিরীক্ষণ করা হয় স্কুলের বাইরে থেকে)। সরকার নিজে যে অনৈতিকতার, অশিক্ষার ও অনিয়মের বীজ বপন করেছেন তা উৎপাটন না করে, প্রাথমিক শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা ও অনিয়মের অভিযোগ এনে অপচেষ্টা করছেন জনমনে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি করতে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্যে অপেক্ষা করছে পাটকলের পরিণতি?
আমেরিকার নিউ অরলিয়ান্সের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনাটুকুকে মনে করুন। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তিন মাস পর ৯৩ বছরের থুত্থুরে বুড়ো ‘আঙ্কল মিলটি’ ওরফে মিলটন ফ্রিডম্যান ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ লিখলেন, ‘নিউ অরলিয়ানসের অধিকাংশ বিদ্যালয় ওইসব স্কুলে পড়াশুনা করা শিশুদের বাড়িঘরের মতোই ভেসে গেছে। এই ছেলেপেলেরা এখন ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জুড়ে। এটি একটি ট্র্যাজেডি। আবার এটি একইসঙ্গে একটি বিরাট সুযোগ, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে রেডিক্যালি সংস্কার করার বিরাট সুযোগ!’ ফ্রিডম্যানের সেই রেডিক্যাল সংস্কারের ধারণাটি ছিল এরকম, সরকারি স্কুলগুলোতে আর সরকারের টাকা খরচ করে পুনর্নির্মাণ ও পুনর্গঠন কাজের কোনও দরকার নেই। অতএব অচিরেই আমেরিকার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয় বেসরকারিভাবে পরিচালিত চারটার বিদ্যালয়ে।
বাংলাদেশেও তাই হতে চলেছে। এ সরকার এবং তাদের সুশীলবন্ধুরা চাইছেন, বাজার-মৌলবাদের স্বার্থে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বেসরকারি করে ফেলতে। কিন্তু এতো আর শ্রমিকদের পাটকল নয় যে সরাসরি কোনও আগাম বার্তা না দিয়েই এসব বন্ধ করে দিয়ে পরে বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দেয়া যাবে। তাই কখনও কামাল হোসেনদের মুখ খুলতে হচ্ছে, কখনও কর্পোরেট-কলামিস্টদের শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে হা-হুতাশ করতে হচ্ছে, কর্পোরেট-সাংবাদিকরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ইতিবাচক খবর ছাপছেন, কর্পোরেট সংবাদপত্রগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে মিলে গোলটেবিল করছে। তাদের উদ্দেশ্য মহৎ : বাজার-মৌলবাদের প্রতিনিধিত্ব করা; শিক্ষাকে বাজারের পণ্যে পরিণত করা। পুরো দেশটিকে একটি বাজারে পরিণত করার আগে তাদের মুক্তি নেই, শান্তি নেই, তৃপ্তি নেই; তাতে দেশের মানুষের শিক্ষার যাই হোক না কেন, কোনও কিছুই আসে-যায় না।
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
পাঁচ.
খাদ্যমূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের কর্পোরেটবাদী মিডিয়াগুলো ব্যাপারটির অপরিহার্যতা ও অনিবার্য ভয়াবহতা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশন করতে লাগলেন। কিছু দৈনিকের কর্পোরেট-কলামিস্টরা এ ব্যাপারে তাদের কলমের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন (হয়তো তাদের অনেকের আন্তরিকতাও আছে, হয়তো তারা বলিভিয়ার প্রক্রিয়াকেই সংকট থেকে উত্তরণের সঠিক প্রক্রিয়া মনে করেন!)। কর্পোরেট কলামিস্টদের কারও কারও মতে, উপদেষ্টা পরিষদের কেউ আসলে ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি। কিন্তু না, তারা ব্যাপারটি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। অর্থনীতির ছাত্র ফখরুদ্দিন আহমদ, এবি মীর্জ্জা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম আর হোসেন জিল্লুর রহমানদের যদি আমরা অবোধ ও নির্বোধ মনে করি, তা হলে তা হবে এ জগতের চিরকালীন সেরা কৌতূক। বরং পরিস্থিতি যাতে ভালোমতো তালগোল পাকায় সে জন্যেই সরকারের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের খাদ্যমজুত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ভারত থেকে চাল আমদানির ব্যাপারে সঠিক সময়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ ছিলেন এবং শুধু তাই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় যে-চাল এসেছিল পাকিস্তান থেকে তা ভালো হওয়ার পরও খারাপ বলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছিল।
এসব কিছুরই তত্ত্বাবধান করছেন আমাদের দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত, ঝানু ও দক্ষ অর্থনীতিবিদরা। আর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। এখন যে আবার মাটির নিচ থেকে চাল তুলে আনা হচ্ছে তারও হয়তো কারণ আছে। হয়তো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন কর্পোরেটবাদীদের।
এতে কোনও সন্দেহ নেই, মধ্যনব্বইতে বলিভিয়াতে যে শক থেরাপী বাজার কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, তারই খেলা চলছে বর্তমানে বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের পর এখানে রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানদের মতো অর্থনীতিবিদরা যে-ধরনের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা এখন একেবারেই সুদূরপরাহত। যদিও ফখরুদ্দিন আহমদ, হোসেন জিল্লুর রহমানরা উপদেষ্টা বনে যাওয়ার পর গুরুদক্ষিণা দিয়েছেন, রেহমান সোবহানকে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পদক ২০০৮ দিয়েছেন, কিন্তু তা আসলে নেহাৎই কৃতজ্ঞতাবশত,- কেননা এদের কেউই আর রেহমান সোবহানের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন না। সাশ যেমন কেইন্সের ভক্ত হওয়ার পরও কেইন্সকে পায়ে দলে এগিয়ে গেছেন, এরাও তেমনি রেহমান সোবহানের ছাত্র হওয়ার পরও রেহমান সোবহানের ধারণাগুলো অগ্রাহ্য করে চলেছেন। এখনও আমাদের সংবিধান বলছে, পরিকল্পিত অর্থনীতি অনুযায়ী দেশ চালানোর কথা (বোধহয় সংবিধানসংশোধনকারী রাজনৈতিক সরকারগুলো এ ব্যাপারটিকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন নি), কিন্তু সরকার বলছে বাজার মৌলবাদের কথা, মুক্ত বাজারের কথা।
এবং তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর থেকেই আমরা দেখছি, মধ্যনব্বইতে বলিভিয়ায় যে ব্যর্থ বাজারকৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, বাংলাদেশেও সেই বাজার কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। জাতীয়করণকৃত পাটশিল্পগুলি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে সেগুলি ব্যক্তিমালিকানায় পুনরায় চালু করার। দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে অব্যাহতগতিতে,- যদিও কর্পোরেটপন্থী মিডিয়াগুলি বারবার জনঅসন্তোষ স্তিমিত করার জন্যে অদ্ভূত সব প্রতিবেদন প্রচার করেছেন, কখনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলোকে দোষারোপ করেছেন, কখনো উপদেষ্টাদের অজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাবের সমালোচনা করেছেন; কিন্তু সবসময়েই আড়ালে রেখেছেন এ দেশীয় শক থেরাপীর প্রণেতা অর্থনীতিবিদদের। জ্বালানিতেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছিল গত এপ্রিল ২০০৭-এ আর সবশেষে সিএনজির মূল্য একলাফে দ্বিগুণ করা হয়েছে এপ্রিল ২০০৮-এ। ১০ এপ্রিল ২০০৮-এ অর্থ উপদেষ্টা এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিদেশ থেকে ফিরেই ঘোষণা দিয়েছেন, আবারও তিনি বাড়াবেন জ্বালানিতেলের দাম। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যমূল্য হু হু করে বেড়েছে আরেক দফা। এসবই শক থেরাপী। আপনি তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠবেন, কিন্তু বুঝতেও পারবেন না এটি আসলে যন্ত্রণা কি না; এবং তারপর হঠাৎ নিথর হয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। একটু পর জেগে উঠবেন, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কী হচ্ছে বোঝার আগে আবারও তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে বোধহীন হয়ে পড়বেন।
কর্পোরেটবাদীরা ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল খাত কৃষি এবং সেটিকেই তাদের টার্গেট করা দরকার। দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটানোর নামে আগে থেকেই এখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা চুক্তিভিত্তিক কৃষি শুরু হয়েছিল। এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার উদ্যোগ নিয়েছেন এটিকে আরও উৎসাহিত করার। আগামী ২০০৮-০৯ সালের বাজেটে চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে সরকারের। এই সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে কর অবকাশ সুবিধা, কমসুদে ব্যাংক ঋণসহ বীমা সুবিধা দেয়া ইত্যাদি। যেসব সুবিধা তারা কৃষককে দিতে নারাজ সেইসব সুবিধা ফার্মিং কোম্পানিকে দিতে সরকারের কোনও কুণ্ঠা নেই। যেমন, কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ছে। তবে এমন কৌশল খাটানো হচ্ছে, যার ফলে কৃষি ভর্তুকি পাবে মূলত কন্ট্রাক ফার্মগুলি। কৃষকরা ভর্তুকি পাক বা না-পাক কিছু আসে যায় না, কিন্তু এসব ফার্মকে ভর্তুকি দিতেই হবে।
কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর পরিকল্পনা নিয়ে যারা এগিয়ে আসছে, সেসব ফার্মিং কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বহুল আলোচিত ব্র্যাক। রয়েছে সুপ্রিম সীড। রয়েছে আগোরা। রয়েছে মীনাবাজার। আরও রয়েছে এনসিসি ব্যাংক ও বোম্বে সুইটস অ্যান্ড চানাচুর। এদের মধ্যে ব্র্যাক বীজের ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করছে এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্র্যাকের কৃষিচিন্তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। কিন্তু সরকারের কাছে এসব প্রশ্ন মোটেও বড় নয়। বড় হলো কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর মধ্যে দিয়ে সাশ-কথিত কাঠামোগত সহায়তা দেয়ার পথটি প্রশস্ত করা। কৃষক ¯^vaxb থাকবে কি না তা বড় ব্যাপার নয়, বড় ব্যাপার হলো কৃষককে নতুন করে দাস বানানো। মানুষ মারা যাবে নাকি বেঁচে থাকবে সেটি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। মানুষের পকেটে টাকা থাকবে কি থাকবে না সেটি চিন্তার ব্যাপার নয়, চিন্তার ব্যাপার হলো মুদ্রাস্ফীতি কমানো।
ছয়.
গত এক বছর ধরে শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে যে শক থেরাপী প্রয়োগ করে আসছেন, তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা সামান্য একটু ধারণা পেতে পারি সমপ্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তুলে ধরা কিছু তথ্য থেকে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বা শক থেরাপী বাজারকৌশল প্রয়োগ করার আগে এখানে ছয় কোটি গরীব মানুষ ছিল, যাদের মধ্যে হতদরিদ্র ছিল সাড়ে চার কোটি মানুষ। মাত্র এক বছরের মধ্যে এই সরকারের কল্যাণে মধ্যআয়ের শ্রেণীপরিধি সংকুচিত হয়েছে; গরিব মানুষের তালিকায় নেমে এসেছেন সেখান থেকে চার কোটি মানুষ। এখন তাই এখানে গরিব মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি আর এদের মধ্যে হতদরিদ্র মানুষ হলেন ছয় কোটি। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সহসভাপতি সাবেক কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল সৈয়দ ইউসুফের এই গবেষণাপ্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত ১৫ মাসে বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। অথচ মানুষের আয় বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ৭০ শতাংশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। উন্নত দেশগুলির অধিবাসীরা নিত্যপণ্য কিনতে ব্যয় করেন তাদের আয়ের আট শতাংশ। আর বাংলাদেশের এই দরিদ্র মানুষজনকে তাদের মোট আয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যয় করতে হয় নিত্যপণ্য কিনতে। এদের প্রকৃত আয় গত একবছরে কমেছে ৪৫ শতাংশ। এই মানুষরা কাপড়চোপড় কিনবে কোত্থেকে? মাথা গোঁজার ঠাঁই তুলবে কোত্থেকে? সন্তানকে স্কুলে পাঠাবে কেমন করে?
তারপরও গার্মেন্টসের শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করে, তখন তার মধ্যে আমরা বিদেশীদের চক্রান্ত দেখি। সাধারণ মানুষ যখন ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়েছে দেখে আশায় বুক বাধে আর ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে শামিল হয় তখন আমরা তাতে সরকারকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র দেখি। মিডিয়ার লোকজনকে দেখি এই সরকারের ওকালতি করে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও কলাম লিখতে। আমাদের কি কোনও লজ্জাই নেই?
সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে কোনও দুর্ভিক্ষ নেই, বড় জোর হিডেন হাঙ্গার রয়েছে। তা হিডেন হাঙ্গারই বটে। সরকার তো রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। কী করে এই দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষরা জানাবে তাদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধার কথা? সরকার তো মিডিয়ার ওপর খবরদারি করছেন, স্তাবকদের লেলিয়ে দিয়েছেন শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুণগান গাইতে। কে তুলে ধরবে এই দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষদের ক্ষুধার কথা?
আর কেইবা তুলে ধরবে এই কর্পোরেটবাদীদের নগ্নক্ষুধার নগ্নতা? বলিভিয়ার যে সর্বনাশা শক থেরাপীর কথা লিখেছি, সে সম্পর্কে বলিভিয়ার জনগণ সর্বপ্রথম জানতে পারে আগস্ট ২০০৫ সালে, সেখানকার সাংবাদিক সুসান ভেলাসকো পোরটিল্লো অনেক অনুসন্ধান চালিয়ে গনির অর্থনৈতিক টিমের সদস্যদের সাক্ষাৎকার আদায় করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাঁড় করানোর পর। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এখানকার বড় বড় মিডিয়াভবনগুলি কর্পোরেটপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে; এখানকার নামকরা কলামিস্টরা আসলে কর্পোরেট-কলামিস্ট। তারা অনেক কড়া কথা লিখতে পারেন, কিন্তু সেই কথা কথার কড়া কলাম কখন ছাপা হবে তা নির্ভর করে কর্পোরেটচক্রের ওপরে।
সুসানের মতো একজন সাংবাদিকের দেখা আমরা কতদিনে পাব! তার প্রতিবেদনটি ছাপানোর মতো একটি পত্রিকা আমরা কতদিনে পাব? কতদিন পর কত অনাহার ও মৃত্যুর বিনিময়ে, কত গৃহহীনতা ও অধিকারহীনতার বিনিময়ে আমরা মেটাতে পারব কর্পোরেটবাদীদের এই নগ্নক্ষুধা!?
তথ্যসূত্র :
এ কে গুপ্ত : মার্কেট ম্যাডনেস, জি-ম্যাগাজিন, জুন ২০০৮ সংখ্যা।
নাওমি ক্লেইন : দ্য শক ডকট্রিন, অ্যালেন লেন, ইংল্যান্ড, ২০০৭।
রাজ প্যাটেল : স্টাফড অ্যান্ড স্টার্ভড : দ্য হিডেন ব্যাটল ফর দি ওয়ার্ল্ড ফুড সিস্টেইম, যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৮।
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, তৃতীয় পর্ব

চার.
স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, কর্পোরেটবাদীদের চোখ পড়েছে এশিয়ার কৃষিবাজারের দিকে। আর খাদ্যবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ার অন্যতম কারণ এটাই। তারা চান কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের বাজারকে নতুনভাবে বিন্যাস করতে। চান কৃষিপণ্যের বাজারকে কর্পোরেটবাদীদের উপযোগী করে তুলতে।
তবে কোনও কোনও দেশকে তো গিনিপিগ হতে হবে। বাংলাদেশ হলো সেই গিনিপিগ, কর্পোরেটবাদীদের কর্পোরেটতন্ত্র পরীক্ষানিরীক্ষার এশিয় গবেষণাগার। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক শাসন প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি, সংগঠিত বামআন্দোলন গড়ে না উঠলেও বুর্জোয়া রাজনীতি প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীল আর পুঁজিবাজারও সুগঠিত নয়। তা ছাড়া এখানে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহও বিকশিত হয়নি যথাযথভাবে। বাজারব্যবস্থাও খুবই দুর্বল। অথচ অন্যদিকে বাংলাদেশের মাটি এতই উর্বর আর কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই এখানকার কৃষি উৎপাদন এত সন্তোষজনক যে এরকম সোনার খনি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার মতো বোকামী আর হতে পারে না। আর চীন ও ভারতের জনবহুল বাজারের দিকে তাকিয়ে লোভাতুর হওয়া যায়, কিন্তু তাদের তো গিনিপিগ বানানো সম্ভব নয়।
অবশ্য, এশিয়ায় না হলেও, বিশ্বব্যাপী কৃষিবাণিজ্য অনেক আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে আসছে কর্পোরেটবাদীরা। ১০টি মুখচেনা বহুজাতিক কোম্পানী নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের চালগমসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনের বীজবাজারের ৫১ শতাংশ। এ ১০টি কোম্পানীর সমগ্র ব্যবসার ৭০ শতাংশ আবার নিয়ন্ত্রণ করছে তাদেরই চারটি কোম্পানী। এদের নাম মোটামুটি সবারই জানা। এরা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের মনসানতো ও দুপন্ট, সুইজারল্যান্ডের সিনজেনটা এবং ফ্রান্সের গ্রুপে লিমাগারিন। অনেকেই জানেন, বাংলাদেশের মহান নোবেল শান্তিবাজ ড. মুহম্মদ ইউনূসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মনসানতো কোম্পানির সঙ্গে।
পৃথিবীজুড়ে খাদ্যসামগ্রীর খুচরা বাজারের এক-চতুর্থাংশ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ ১০টি খাদ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। এই ১০টি কোম্পানীর সমগ্র বাজারের ৬৫ শতাংশ রয়েছে আবার আমেরিকার ওয়ালমার্ট, ফ্রান্সের কোরেফুর, জার্মানীর মেট্রো এজি এবং নেদারল্যান্ডসের আহোলন্ড-এর নিয়ন্ত্রণে।
উন্নত দেশগুলি কৃষিভর্তুকি দিয়ে তাদের কৃষিখাতকে শক্তিশালী করে রেখেছে। আবার কৃষিপণ্যের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে এসব দেশেরই হাতেগোণা বাণিজ্যিক কোম্পানীগুলো। এসব বাণিজ্যিক বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই উন্নয়নশীল ও ¯^‡ívbœZ আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় তুঙ্গে উঠেছে। কেননা এসব বহুজাতিক বাণিজ্যিক কোম্পানীগুলোই মূলত কৃষিবাণিজ্যে বৈষম্যমূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধির সুবিধা নিচ্ছে। আর উন্নত দেশগুলোর কৃষিভর্তুকির সুবিধাগুলোও সেখানকার কৃষকদের বদলে মূলত লুটে নিচ্ছে এসব কোম্পানীগুলো।
এই কোম্পানিগুলো এখন চাইছে বিশ্বের যেসব দেশের কৃষিবাজার তাদের তত্ত্বউপযোগী নয়, সেসব দেশের কৃষিবাজারকে তেমনটি করে তোলার।
এপ্রিল ২০০৮-এর মধ্যেই এ বিষয়টি কারও কারও চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একে একে ভয়ংকর সব খবর আসতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টে ২৬ এপ্রিল ২০০৮-এ খবর বের হলো, চাল, গম, আটাসহ খাদ্যশস্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। আর এর ফলে বাংলাদেশ, ক্যামেরুন, ফিলিপাইনসহ বেশকিছু দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কেননা সেখানে দেখা দিচ্ছে সহিংসতা। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট বি যোয়েলিক বললেন, খাদ্যসংকটের কারণে বিশ্বের আরও ৩০টি দেশে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। আর হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বললেন বিশেষভাবে বাংলাদেশের কথা। বললেন, বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলির মানুষের খাবার কেনার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। এইভাবে বাংলাদেশ আলোচনার পাদপ্রদীপে চলে এলো।
যদিও ম্যানিলাভিত্তিক গবেষণাসংস্থা ইরির পক্ষ থেকে বলা হলো, এই সংকট মানবসৃষ্ট, কিন্তু কেউই সে কথা গায়ে মাখলেন না। বলা হতে লাগল, জৈবজ্বালানি উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট সৃষ্টি দেখা দিয়েছে। বলা হতে লাগল, এই সংকটের কারণ ভারত ও চীনের খাদ্যবাজার বেড়ে গেছে।
কিন্তু শক থেরাপী বাজারকৌশলের প্রধান শর্তই হলো, লোহা গরম থাকতে থাকতেই ছ্যাঁকা দিতে হবে। অতএব খুব দ্রুতই সুগঠিত প্রস্তাব এলো ২০০৬ সালে মিল্টন ফ্রিডম্যানের মৃত্যুর পর মুক্ত বাজারের নব্য পথিকৃৎ মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফ্রী সাশের পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, জরুরি সাহায্য দেয়ার কোনও মানে নেই। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার। এ রকম একটি প্রস্তাব যে আসবে সেটি অবশ্য অনুমান করা যাচ্ছিলো। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, খাদ্যসংকটগ্রস্থ আফ্রিকার দেশগুলিকে তারা সহায়তা করবেন, তবে আগের মতো করে নয়। এবার আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের জাহাজে করে খাদ্যসাহায্য পাঠাবেন না তারা। বরং আফ্রিকার যেসব দেশ খাদ্য উৎপাদন করে, সেসব দেশ যদি খাদ্য বিক্রি করে তা হলে সেই খাদ্য কেনার টাকা দিয়ে সহায়তা করবেন মাত্র।
আপাতদৃষ্টিতে জেফ্রী সাশের কথাবার্তা ও নীতিপ্রণালী খুবই নিরীহ। কিন্তু আসলে তা তত নিরীহ নয়। কেননা কাঠামোগত সহায়তা দেবে কর্পোরেটবাদীরা; আর তাদের কাছে চিরদিনের মতো বাঁধা পড়ে যাবে আমাদের মতো দেশগুলোর স্থানীয় কৃষি বাজার। এ পরামর্শের আরেকটি লক্ষ্য, জৈবজ্বালানীর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বসন্তে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আগামী ২০২০ সালের মধ্যে তারা পরিবহন ক্ষেত্রে জৈবজ্বালানির পরিমাণ ১০ শতাংশে উন্নীত করবে, যা আগামী ২০১০ সালের মধ্যে ৫.৭৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা আরও আগেই নেয়া হয়েছিল। জেফ্রী সাশ-রা এই পরিকল্পনাকে একদম সহ্য করতে পারছেন না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নয়ন কমিটির সামনে জেফ্রী সাশ বলেছেন, পৃথিবীব্যাপী খাদ্যমূল্যের ক্ষেত্রে যে সংকট দেখা দিয়েছে তা খাদ্য সরবরাহের রুদ্ধপ্রক্রিয়ার কারণে ঘটছে না; এ-অবস্থার জন্ম হয়েছে খাদ্যের ক্রমবর্ধিষ্ণু চাহিদা থেকে। পৃথিবীতে খাদ্যের এই সরবরাহ ও চাহিদাসংকটের কারণ, সাশ-এর মতে, দরিদ্র অঞ্চলগুলিতে খাদ্যউৎপাদন Ôযা হওয়া উচিত তার চেয়ে অনেক কম।Õ অতএব এইসব দেশে এমন কাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারে।
সাশ এখানেই থামেননি। তিনি তাঁর সাফল্যের উদাহরণও তুলে ধরেছেন। বলেছেন, পৃথিবীর একটি গরিব রাষ্ট্র মালোয়িতে এ ধরনের কাঠামোগত সহায়তা দেয়া হয়েছে এবং গত তিন বছর ধরে সেখানে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হচ্ছে। তিনি বলেছেন, প্রকৃতির মতিগতি বোঝা বড় দায় হয়ে পড়েছে। অতএব অর্থায়ন করতে হবে মূলত এমন ধরণের বীজ উদ্ভাবনী গবেষণার ক্ষেত্রে, যে ধরনের বীজ খরা ও আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। অর্থাৎ কাঠামোগত সহায়তার নামে যা-যা করা হবে তার সব সুফলই ভোগ করবে কর্পোরেট সংস্থাগুলো।
আর মালোয়ির অবস্থা? আপাতত শুধু এটুকুই বলা যায়, মালোয়িতে শস্য উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে দরিদ্র কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে!
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
তিন.
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর দুর্নীতিতে আক্রান্ত রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার নামে প্রকাশ্যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়, নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়; কিন্তু সংগোপনে শুরু হয় বাজার পুনর্গঠনের কাজ। আর তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। হু হু করে জিনিসপত্রের মূল্য বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের কর্পোরেটপন্থী মিডিয়াগুলো এখনও ছবক দিয়ে চলেছে, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ার পেছনে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনও হাত নেই। কারণ, এসব মিডিয়াগুলোর প্রচারণার ভাষায় বলতে গেলে, Ôআন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোতে জ্বৈবজ্বালানি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রসারিত হয়েছে চীন ও ভারতের মতো জনবহুল দেশের খাদ্যবাজার। খাদ্যমূল্য বাড়ছে এসব কারণে।Õ শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে তারা আরও একটি সত্য জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে : Ôআগামী এক বছরের মধ্যে খাদ্যমূল্য কমার কোনও সম্ভাবনাই নেই এবং সস্তা খাবারের যুগ শেষ।Õ
আপাতদৃষ্টিতে এসব সত্যই বটে। সত্য শস্য-তালিকা ক্রমাগত কমে আসছে, এশিয়ায় পশুজাত সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে পৃথিবী জুড়ে জনসংখ্যা, বৈশ্বিক তাপমাত্রা, জৈবজ্বালানির চাহিদা, দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্যিক ফটকাবাজী, কমছে ডলারের দাম, প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে অশোধিত তেলের বাজারমূল্য, বিরূপ ভূমিকা রাখছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর নীতিসমূহ, আমদানি প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি সব কিছু। এসবের প্রতিটিই কোনও না কোনওভাবে পণ্যমূল্য বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
তারপরও দেখা যাচ্ছে, এ-সব সত্যের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। যেমন, জনবহুলতার হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম বড় বাজার ভারত ও চীনে। কর্পোরেট গবেষকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ দুটি দেশের মানুষদের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষত মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্যের মাধ্যমে। অথচ মানুষের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়াটা কোনও নতুন প্রবণতা নয়, দশকের পর দশক ধরে দেশকাল নির্বিশেষে এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এটি পুরোপুরি অস্বাভাবিক যে, ২০ থেকে ৩০ বছরের একটি স্থিতিশীল ও ধারাবাহিক বৃদ্ধিহারের বিপরীতে দু’এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাবে। উদাহরণত, ভারতে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৩-এর মধ্যে ব্যক্তিপ্রতি ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ১৫৩ ক্যালরি, তার মানে বছরপ্রতি ১২ ক্যালরির মতো; চীনে সেখানে মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ২৩১ ক্যালরি, অর্থাৎ বছরপ্রতি ১৮ ক্যালরি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১০ ক্যালরি। অর্থাৎ ক্যালরি গ্রহণের তারতম্য দিয়েই যদি পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণ দাঁড় করানো হয়, সে-ক্ষেত্রে দায়ী করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকেই। আবার শস্য-তালিকা ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে এলেও গেল বছর ফসল উৎপাদন অনেক বেড়েছে। আমাদের শোনানো হচ্ছে খাদ্য আর এনার্জি, এ-দুয়ের উত্তরোত্তর চাহিদা বাড়ার কথা আর সরবরাহে অনিয়মের কথা; কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় খরা হলেও, চীনে বরফপাত ও তুষারঝড় বয়ে গেলেও এবং মার্কিনী ব্রেডবাস্কেটে ঠাণ্ডা ও আর্দ্র শীত নেমে এলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। ইউএন খাদ্য ও কৃষি সংগঠন আমাদের তথ্য দিচ্ছে যে, বার্ষিক বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন ৯২ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে গিয়ে ২০০৭-২০০৮ সালে ২.১০২ বিলিয়ন টনে ঠেকেছে। তবে এই বৃদ্ধির প্রায় সবটাই ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে। আর যুক্তরাষ্ট্র সে-শস্য জৈবজ্বালানি শিল্পে যোগান দেয়ার তথ্য দেখাচ্ছে। তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু উদ্ঘাটন করা সত্যিই কঠিন যে সুপরিকল্পিত ফাটকাবাজী কীভাবে ঘটেছে। রাজ প্যাটেলের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর পশুদের খাওয়ানো হয়েছে ৭৪০ মিলিয়ন টন খাদ্য, যা দিয়ে বর্তমান সময়ের খাদ্যঘাটতিকে কমপক্ষে ১৪ বার ঠেকানো যেত। মূল্য বেড়ে যাওয়ার জন্যে জৈবজ্বালানি শিল্পবাদীরা আবার আগ্রহী চীনকে দোষারোপ করতে। গত এপ্রিল ২০০৮-এ তাদের পত্রিকা বায়োফুয়েল ডাইজেস্টস-এ একটি সমীক্ষা ছাপা হয়েছে এই শিরোনামে : Ôবৈশ্বিক শস্যঘাটতির কারণ চীনের মাংসব্যবহার।Õ অথচ ওই সমীক্ষাতেই দেখানো হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০০৭ এর মধ্যে চীনের মাথাপিছু মাংসচাহিদা বেড়েছে মাত্র সাত পাউন্ডেরও কম। একইভাবে এনার্জি চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে তথা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্যেও চীন ও ভারতকে দায়ী করার চেষ্টা চলছে। চীন ও ভারত প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট ব্যবহার করে। অথচ এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিমাণ ২০.৬ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের অর্ধেকেরও কম। চীন ও ভারতের মিলিত জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৮ গুণ বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিমাণের অর্ধেক পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট ব্যবহার করেও অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে তাদের!
কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবেই যদি বলতে হয়, তা হলে বলতে হয়, যেমনটি বলেছেন এ কে গুপ্ত, বলেছেন, Ôযদি কেউ প্রধান অপরাধীই হয়ে থাকে, তা হলে সেটি হচ্ছে বাজার।Õ তিনি বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক বাজারের প্রকৃতি,- যা পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। বাজারের মাধ্যমেই চলছে বাণিজ্যিক ফটকাবাজী, বাজারের কারণেই ঘটছে ডলারের মূল্যপতন, আবার ডলারের মূল্যপতনের কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে তেলের বাজার; পশ্চিমা জগতের কৃষিভর্তুকিতে উৎপন্ন খাদ্যসামগী্র গরিব দেশগুলোতে বাজারজাত করার মাধ্যমে বাধ্য করা হচ্ছে এসব দেশের কৃষিক্ষেত্রকে ÔউদারÕ হতে, কিন্তু এই উদারতা বরং মৃত্যু ঘটাচ্ছে স্থানীয় কৃষিবাজারের, এর দখল চলে যাচ্ছে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর হাতে। আর এইসব কারণকে একসূত্রে বেঁধেছে Ôরাজনীতি।Õ কেননা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয় অনিয়ন্ত্রিত ফাটকাবাজি হবে কি না, পণ্যবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কমবে কি না; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই বলে দেয় ঘাটতি বাড়িয়ে এবং সুদের হার কর্তন করে ডলারকে অবমূল্যায়িত করা হবে কি না এবং গরিব দেশগুলোকে তাদের কৃষিক্ষেত্রের ওপর থেকে সহায়তা কমিয়ে আনার জন্যে বাধ্য করা হবে কি না। এটিও তাই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,- খাদ্যকে একটি মৌলিক অধিকার ধরে গরিবদের সেখানে প্রবেশাধিকার দেয়ার বদলে বাজার থেকে কিনতে বাধ্য করা হবে। অর্থাৎ প্রচলিত দৃষ্টিগ্রাহ্য ও প্রচারিত জনপ্রিয় সত্যের আড়ালে রয়েছে অন্যতর আরও এক নির্মম সত্য, আর তা হলো কর্পোরেটবাদীদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থেকেই বাড়ছে বাজারে পণ্যের মূল্য। রাষ্ট্রকাঠামো, সরকার, রাজনীতিক এবং অর্থনীতিবিদরা যে এরকম অর্থনৈতিক ফাটকাবাজী চালিয়ে যাওয়াকে অনুমোদন করছেন, সেটি রীতিমতো অপরাধ। রাজ প্যাটেল তা বলেছেন, কিন্তু তিনি যদি নাও বলতেন, তবুও তা নিঃসন্দেহে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবেই দেখা হতো। সময় নিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডামাথায় চিন্তাভাবনা করে এ-পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এ-পরিকল্পনার গোপন ও শান্ত অংশীদার। এমনকি বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যে সরকার আসবে তাকেও এ-পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে। না হলে সে-সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে অথবা যারা এ-পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন বা করবেন সে-রকম কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতাতেও আসতে দেয়া হবে না। বরং যারা এ-পরিকল্পনাটিকে সমর্থন করবেন, বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবেন, তাদের মধ্যেকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীটিকেই আগামীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে আসা হবে।
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব
বক্তৃতারত অবস্থায় অর্থনীতিবিদ জেফ্রী সাশ
তাঁর নাম জেফ্রী ডেভিড সাশ।
মার্কিন এ-ভদ্রলোক পেশাগত জীবনে অর্থনীতিবিদ। তা ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। কিন্তু এসবই তাঁর খুব শাদামাটা পরিচয়। বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সাশের গৌরবময় পরিচিতি হলো শক থেরাপী বাজারকৌশলের সফল প্রয়োগকারী হিসেবে। তাঁর পৌরহিত্যেই মধ্যনব্বইয়ে বলিভিয়ায় এবং বার্লিনপ্রাচীর ধ্বসে পড়ার পর পূর্ব জার্মানিতে শকথেরাপী বাজারকৌশল প্রয়োগ করা হয়।
১৯৮৫ সালে বলিভিয়ার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসন বলিভিয়াকে পঙ্গু করে ফেলেছিল। কিন্তু মধ্যনব্বইয়ে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের মতো বলিভিয়ায়ও দীর্ঘ ১৮ বছর পর গণতন্ত্রের হালকা হাওয়া লাগে। বলিভিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন রিগানের পরামর্শে নেয়া কিছু পদক্ষেপের কারণে অবর্ণনীয়রকম বাজে। দেশটিকে প্রতি বছর ঋণের সুদ হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ গুণতে হচ্ছিল তা ছিল জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। আর মূদ্রাস্ফীতি ছিল ১৪,০০০ শতাংশ।
এরই মধ্যে ১৯৮৫ সালে বলিভিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রাক্তন একনায়ক হুগো বানসার আর প্রাক্তন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ভিক্টর পাস এস্তেনসরো। হুগো বানসার নিশ্চিত ছিলেন, নির্বাচনে তিনি জয়ী হবেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই বানসারের পার্টি উদ্যোগ নেয় মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনার উপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের। সঙ্গতকারণেই তাদের মনে হয় এই জেফ্রী সাশ-এর কথা,- যিনি তখন হাভার্ডের অর্থনীতি বিভাগের একজন তরুণ অথচ অ্যাকাডেমিক প্রতিভার গুণে সুপরিচিত শিক্ষক – কারণ কয়েক মাস আগে বলিভিয়ার একদল রাজনীতিক হাভার্ড সফরে গেলে সাশ তাদের সামনে বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন, এই মুদ্রাস্ফীতিজনিত সংকট তিনি তাঁর পরিকল্পনার জোরে রাতারাতি ঝেড়ে ফেলতে পারেন।
এমনিতে সাশ ছিলেন অর্থনীতিবিদ কেইন্সের গুণমুগ্ধ, যার অর্থনৈতিক তত্বের সঙ্গে শিকাগোর মিল্টন ফ্রিডম্যানের তত্ত্বের বিরোধ সুবিদিত। প্রথম মহাযুদ্ধের পর উচ্চমুদ্রাস্ফীতি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের বিস্তৃতির পারস্পারিক সম্পর্কজনিত কেইন্সের লেখা থেকে সাশ অনুপ্রাণিত হন দারুণভাবে। অর্থনীতিবিদ কেইন্সের এ-উদ্ধৃতি ছিল তাঁর খুবই প্রিয় : ÔÔসমাজের বিদ্যমান ভিত্তি উল্টে দেয়ার জন্যে মুদ্রাকে বিপথগামী করার চেয়ে আর কোনও সূক্ষ্ণতর, নিশ্চিততর উপায় নেই। এ-প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক নিয়মের সকল লুকায়িত শক্তিসমূহকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।ÕÕ অর্থনীতিবিদদের পবিত্র দায়িত্ব হলো ধ্বংসাত্মক ওইসব শক্তিগুলিকে যে কোনও মূল্যে দমন করা,- তিনি ছিলেন কেইন্সের এ দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী।
কিন্তু দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কেইন্সের অর্থনীতিসংক্রান্ত বিশ্বাসের ভাগীদার হলেও তিনি ছিলেন রিগ্যানের আমেরিকাজাত সন্তান। আর রিগ্যানের আমেরিকা থেকেই উত্থান ঘটতে শুরু করে মিল্টন ফ্রিডম্যানের। এবং সাশ ছিলেন এই ফ্রিডম্যানের বাজারবিশ্বাসের, যথাযথ অর্থব্যবস্থাপনার ধারণার অনুসারী।
বলিভিয়ায় তখন প্রয়োজন ছিল পুরানো ঔপনিবেশিক মালিকানা কাঠামো ভেঙে ফেলার। ভূমিসংস্কার, বাণিজ্য সংরক্ষণ ও ভর্তুকি, প্রাকৃতিক সম্পদের জাতীয়করণ এবং সমবায়গতভাবে পরিচালিত কর্মস্থল ইত্যাদি বিবিধ উদ্ভাবনমূলক পন্থাতেই কেবল সম্ভব ছিল দেশটিকে রক্ষা করা। কিন্তু সত্যিকারের এ কাঠামোগত পরিবর্তনের ব্যাপারে সাশ-এর কোনও আগ্রহ ছিল না। কেননা তিনি নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ছাড়াও বলিভিয়ার আরেকটি মারাত্মক সমস্যা হলো সমাজতান্ত্রিক রোমান্টিকতা। তাঁর কাছে মনে হলো, তিনিও আরেক কেইন্স হতে পারবেন বলিভিয়াকে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করার মধ্যে দিয়ে। একবারও তাঁর মনে হলো না, জার্মানি থেকেও মুদ্রাস্ফীতি দূর করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু মহাবিপর্যয় ও ফ্যাসিজমের হাত থেকে জার্মানিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
তা ছাড়া কেইন্সবাদের মূল কথা হলো, মারাত্মক অর্থনৈতিক পশ্চাৎপসারণে আক্রান্ত দেশগুলিতে অর্থনীতিকে সচল করার জন্যে প্রয়োজন অর্থ ঢালা। কিন্তু সাশ নিলেন এর ঠিক বিপরীত পন্থা, তিনি বললেন, সংকটের মাঝখানে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, বিভিন্ন কিছুর মূল্য বাড়িয়ে দিতে হবে। চিলির ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই সংকোচন রেসিপি অনুসরণ করা হয়েছিল, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিপর্যয় ঘটানো হয়েছিল; আর Ôবিজনেস উইকÕ পত্রিকা ওই চিলিকে বর্ণনা করেছিল Ôড. স্ট্রেইঞ্জলভ ওয়ার্ল্ডÕ হিসেবে।
বানসারের প্রতি সাশ-এর উপদেশ ছিল খুবই খোলামেলা : কেবলমাত্র বেমওকা এক শক-থেরাপির মাধ্যমেই সম্ভব বলিভিয়াকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সংকট থেকে রক্ষা করা। এর নমুনা দিতে গিয়ে তিনি প্রস্তাব দিলেন, তেলের দাম দশগুণ বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে আরও সব পণ্যের মূল্য। তিনি বললেন, অমুক অমুক জায়গায় বাজেট কর্তন করতে হবে। বলিভিয়ান-আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আবারও জোর গলায় ভবিষ্যতবাণী করলেন, Ôএকদিনের মধ্যেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পরিসমাপ্তি ঘটবে।Õ কেননা ফ্রিডম্যানের মতো সাশ-ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বেমওকা নীতিঝাঁকুনির মধ্যে দিয়ে Ôএকটি অর্থনীতি তার শেষপ্রান্ত থেকে, সমাজতন্ত্রের প্রান্ত থেকে, ব্যাপক দুর্নীতির প্রান্ত থেকে অথবা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনার প্রান্ত থেকে একটি স্বাভাবিক বাজার অর্থনীতিতে পুনর্গঠিত হতে পারে।Õ
সাশ যখন এইসব কড়া সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সে সময়েই বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়। নির্বাচনে হুগো বানসার প্রথম হলেন, দ্বিতীয় হলেন পাস এস্তেনসরো। প্রচারণার সময় এস্তেনসরো কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন সে-সম্পর্কে খুব কমই বলেছিলেন। তা ছাড়া ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগঅবধি বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। পাস-ই ছিলেন একসময় বলিভিয়ায় চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনগুলোর উদ্যোক্তা, বড় বড় মাইনগুলি জাতীয়করণ করেন তিনি, আদিবাসী কৃষকদের কাছে জমি বন্টন করতে শুরু করেন, সকল বলিভিয়ানের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেন। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাস হয়ে পড়েন বলিভিয়ার রাজনীতির এক রহস্যপুরুষ। ১৯৮৫-এর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি আবারও তাঁর Ôজাতীয়তাবাদী বিপ্লবাত্মকÕ অতীতের প্রতি তাঁর আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং রাজস্ব কার্যক্রম সম্পর্কে বড় বড় বুলি ঝাড়তে থাকেন। যদিও তিনি সমাজতান্ত্রিক ছিলেন না, তবে অন্তত শিকাগো স্কুলের নিওলিবারাল হবেন না – অন্ততপক্ষে বলিভিয়ানদের এরকমই ধারণা ছিল।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি কে হবেন, চূড়ান্ত সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল কংগ্রেসের ওপর। আর পর্দার আড়ালে পার্টি, কংগ্রেস ও সিনেটের এই দেনদরবারে বানসার হেরে গেলেন। পাস-কে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তুলে আনার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখলেন একজন নির্বাচিত সিনেটর গনসালো সানচেস দে লোসাদা, যিনি বলিভিয়ায় সাধারণভাবে পরিচিত গনি নামে। এত দীর্ঘদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন যে তিনি স্প্যানিশ বলতেন মার্কিনী উচ্চারণে। বলিভিয়ায় তিনি ফিরে এসেছিলেন দেশটির সবচেয়ে সম্পদবান ব্যবসায়ী হবার লক্ষ্য নিয়ে। ওই সময়েই তিনি ছিলেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যক্তিমালিকানাধীন খনির মালিক, যা পরে পরিণত হয় দেশের বৃহত্তম খনিতে। গনি লেখাপড়া করতেন ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে। অর্থনীতির ছাত্র না হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন ফ্রিডম্যানের বাজারমন্ত্রে। তখনও বলিভিয়ার খনিসম্পদ ছিল মুখ্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। তাই সাশ যখন বানসারের টিমের কাছে তাঁর শক-থেরাপী তুলে ধরেন, গনি তাতে প্রভাবিত হন ভীষণরকম। বলিভিয়ায় নিযুক্ত ওই সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূতও ভূমিকা রাখেন এ-ব্যাপারে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর তিনি বলেন, কেবলমাত্র শকরুট ধরে এগিয়ে গেলেই বলিভিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য অব্যাহত থাকবে।
পর্দার আড়ালের বিভিন্ন সমীকরণ থেকে আগস্ট ০৬, ১৯৮৫তে পাস-এর হাতে বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব তুলে দেয়া হলো কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। আর এর মাত্র চারদিন পর বলিভিয়ার অর্থনীতিকে ঝড়ের গতিতে আমুল পরিবর্তন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ-গোপনীয় দ্বি-পক্ষীয় অর্থনৈতিক টিমের নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে পাস-এর পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হলো গনসালো সানচেস দে লোসাদা ওরফে গনিকে। আর এই টিম বেছে নিলো সাশ প্রস্তাবিত শক-থেরাপীকে। কয়েক দশক আগে পাস-এর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের যে-রূপ নির্মিত হয়েছিল, সেটি বাতিল করার পরিকল্পনা নেয়া হলো। এমনকি পাস-এর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও অন্ধকারে ছিলেন অর্থনৈতিক এই টিম ও পরিকল্পনার ব্যাপারে। বলিভিয়ার সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন আর কৃষক সংগঠনগুলি যাতে এ ব্যাপারে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে না পারে, সে-জন্যে বজায় রাখা হলো কঠোর গোপনীয়তা। ১৭ দিন পর পাস-এর পরিকল্পনামন্ত্রী গিলের্মো বেদ্রেগাল বলিভিয়ার শক-থেরাপী কর্মসূচির ড্রাফটটি তাঁর হাতে পেলেন। এতে বলা হলো খাদ্য ভর্তুকি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রায় সবটাই বাতিল করা হবে এবং তেলের মূল্য ৩০০ শতাংশ বাড়ানো হবে। বলা হলো এর ফলে অবস্থার যত অবনতিই ঘটুক, এমনকি সরকারি বেতনও বাড়ানো হবে না। বলা হলো, সরকারি ব্যয় একেবারেই কমিয়ে ফেলা হবে, বলিভিয়ার সীমান্তে কোনও আমদানিপ্রতিবন্ধকতা থাকবে না এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানীগুলো সংকুচিত করা হবে অথবা বেসরকারিকরণ করা হবে। সত্তর দশকের ব্যর্থ নিওলিবারাল বিপ্লব নতুন করে শুরু হলো বলিভিয়াতে।
যারা এ-পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা নিজেরাই শংকিত ছিলেন বলিভিয়ার জনগণের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। অর্থনৈতিক টিমটি যখন বলিভিয়ার আইএমএফ কর্মকর্তাদের হাতে এই পরিকল্পনার খসড়া তুলে ধরেন তখন আইএমএফ প্রতিনিধি যা বলেছিলেন তা ছিল একইসঙ্গে উৎসাহব্যঞ্জক ও ভীতিকর। তিনি বলেছিলেন, Ôআইএমএফ-এর প্রতিটি কর্মকর্তা যেরকম স্বপ্ন দেখে, এটি হলো সেরকমই এক পরিকল্পনা। কিন্তু যদি এটি কাজ না করে, তা হলে সৌভাগ্যজনক ব্যাপার হলো আমার জন্যে আছে কূটনৈতিক আশীর্বাদ। বিমানে চড়ে পালিয়ে চলে যেতে পারব আমি।Õ
এ-পরিকল্পনা নিজেদের কাছেই এত ভয়াবহ মনে হয়েছিল যে ওই টিমের সবচেয়ে তরুণ সদস্য ফারনান্দো প্রাদো বলেছিলেন, Ôতারা (জনগণ) আমাদের মেরে ফেলবে।Õ আর পরিকল্পনার মূল লেখক ও বলিভিয়ার পরিকল্পনামন্ত্রী বেদ্রেগাল তখন বলেছিলেন, Ôআমাদের হতে হবে হিরোশিমার পাইলটের মতো। যখন সে পারমাণবিক বোমা ফেলছিল তখনও সে জানতো না কী সে করতে চলেছে। কিন্তু ধোঁয়া উড়তে দেখে সে বলেছিল, ওওপস…স্যরি! এবং ঠিক এমনটাই আমাদের করতে হবে, পরিকল্পনাটা শুরু করতে হবে এবং তারপর বলতে হবে: এহ্…স্যরি!Õ
এইভাবে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলো। মাত্র পাঁচটি অনুলিপি করা হলো পরিকল্পনার। একটি কপি রাষ্ট্রপতি পাস-এর জন্যে, একটি কপি তাঁর উপদেষ্টা গনির জন্যে, একটি কপি ট্রেজারি মন্ত্রীর জন্যে। বাদবাকি দুটি কপি কাদের জন্যে করা হয়েছিল তা জানতে পারলেই আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে, কথিত গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পাস সেদিন তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে আসলে নির্ভর করছিলেন কাদের ওপর। বাকি দুটো কপি তৈরি করা হয়েছিল, একটি সেনাবাহিনীর প্রধানের জন্যে আর আরেকটি পুলিশপ্রধানের জন্যে!
তিন সপ্তাহ পর বলিভিয়ার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক বসল। সেখানে ৬০ পৃষ্ঠার পরিকল্পনাটি পড়ে শোনানো হলো। এসময় পাস তাঁর মন্ত্রিদের উদ্দেশ্যে বললেন, এটি তাদের পড়ে শোনানো হচ্ছে শুধুমাত্র জানানোর জন্যে, বিতর্কের জন্যে নয়। তাদের এ পরিকল্পনার ব্যাপারে কোনও আপত্তি থাকলে তারা পদত্যাগ করতে পারেন। প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখালেন শিল্পমন্ত্রী। বললেন, আমি একমত নই।
তা হলে আপনি আসুন।- পাস বললেন তাঁকে। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী উঠলেন না, গেলেন না। এবং তারপর সবাই চুপ হয়ে গেলো। কেউ আর কিছুই বললেন না, পদত্যাগও করল না। কিছুদিন পর সাশ বলিভিয়ায় এসে পাস-এর উপদেষ্টা হিসেবে মোটামুটি স্থায়ীভাবে খুঁটি গেঁড়ে বসলেন। পণ্যমূল্যবৃদ্ধির ঘোরতর সমর্থক হলেও বেতনবৃদ্ধির ঘোরতর বিরোধী হিসেবে তিনি সক্রিয়তা দেখাতে লাগলেন।
দুই বছরের মধ্যে বলিভিয়ার মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশে নেমে এলো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পরিস্থিতির উন্নতি হলো। প্রকৃত মজুরি বরং আরও ৪০ শতাংশ কমে গেল। ১৯৮৫ সালে শক-থেরাপী শুরু হওয়ার বছরে বলিভিয়ার মানুষের মাথা পিছু আয় ছিল ৮৪৫ ডলারে। আর দু বছর পরে তা নেমে দাঁড়ালো ৭৮৯ ডলারে। ১৯৮৭ সালে বলিভিয়ার একজন কৃষকের গড় বার্ষিক আয় নেমে এলো বছরে মাত্র ১৪০ ডলারে, যা সেখানকার মাথাপিছু গড় আয়ের মাত্র এক-পঞ্চমাংশেরও কম!
কিন্তু এসবে কোনও কিছুই এলো-গেলো না। কেননা বলিভিয়ার সাধারণ মানুষ অনাহারে মারা যাক, কাজ না পেয়ে ভিক্ষা করুক, বাড়িঘর বিক্রি করে তাবুতে বাস করুক, তাদের মেয়েরা বেশ্যা হয়ে যাক,- তাতে কিইবা আসে যায়? মুদ্রাস্ফীতি তো কমেছে! সাশ-এর ওপর অর্পিত দায়িত্ব তো এটিই ছিল! সাপের কামড়ে মানুষ মারা গেছে, তাতে কি হয়েছে? চোখ তো বেঁচে গেছে!
দুই.
জেফ্রী সাশ আর বলিভিয়ার এই সত্যিকারের কাহিনী কেন আবারও মনে করলাম?
কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে এই জেফ্রী সাশ আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। গত ০৫ মে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের সামনে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট সমাধানের রূপরেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, Ôযদি আমরা শুধুমাত্র জরুরী খাদ্যসাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি তা হলে এ সমস্যার সমাধান করতে পারব না।Õ কী করতে হবে তা হলে? না, জরুরি সাহায্য দেয়া চলবে না। তার বদলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির গরিব কৃষকদের কাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে। এবং এভাবেই সমস্যা সমাধানের একটি দীর্ঘমেয়াদী পথ তৈরি হবে। তিনি তাই বলেছেন, Ôব্যয়বহুল খাদ্যসামগ্রী জাহাজীকরণ করার বদলে আমাদের বরং উচিত গরিবদের মধ্যেকার গরিবতরদের আরও বেশি বেশি খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করা।Õ
জেফ্রী সাশ আর বলিভিয়ার এই সত্যিকারের ঘটনা মনে করার আরও একটি কারণ : আর মাত্র দুÕএক বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীর পাহারায় বাংলাদেশের প্রচল রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা আমাদের প্রিয় দেশটিতে বলিভিয়ার মতোই ভয়ঙ্কর সব পরিণতি ডেকে আনার পরিকল্পনা ফেঁদেছেন। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক অবধি মার্কিন অর্থনীতিবিদরা ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে যে শক-থেরাপী পদ্ধতির প্রয়োগ করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন, একবিংশ শতাব্দীতে সেই ব্যর্থ মডেলটি বাংলাদেশে প্রয়োগ করে মূলত ঠাণ্ডা মাথায় লাখ লাখ মানুষকে অনাহারে ও বিনা কাজে মারার হিংস্র খেলায় মেতে উঠেছেন তাঁরা। (আগামীপর্বে সমাপ্য)।
শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার : সামান্য মুখবন্ধ
অভয় দিচ্ছি শুন্ছ না যে? ধরব না কি ঠ্যাং দুটা?
বস্লে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা।
আমি আছি, গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে
সবাই মিলে কাম্ড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।
- সুকুমার রায়
আমাদের অনেকেরই মনে আছে, ২০ আগস্ট ১৯৭৫-এ সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর কালক্রমে বাংলাদেশের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের মধ্যে সোভিয়েতপন্থী বামপন্থীরা অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব আর চৈনিক বামপন্থীরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মতো অসাধারণ নেতৃত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য জিয়াউর রহমান অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেন নি; জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের উপযোগী কোনও পথও তৈরি করেন নি। উল্টো তিনি মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত ১৯৭২-এর সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা করেছিলেন, ধর্মজ রাজনৈতিক দলগুলিকে রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকার দিয়েছিলেন, ধর্মজ রাজনীতির অনুসারী যেসব নেতা-কর্মীরা যুদ্ধাপরাধজনিত অপরাধে বিচারের জন্যে কারাগারে ছিলেন কলমের এক খোঁচায় তাদের মুক্তি ও নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন, মুক্তবাজার গঠন ও বেসরকারিকরণের কাজ জোরদার করেছিলেন। আর এসবের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান ও তার সহযোগীদের মোক্ষম যুক্তিটি ছিল : Ôএকদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হত্যা করা হয়েছে। আমরা চাই বহুদলীয় গণতন্ত্র।Õ শুধুমাত্র চতুর্থ সংশোধনীটি অকার্যকর ও বাতিল করেই এই গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা তা করতে উৎসাহী হন নি। কেননা তাদের বিশেষ কর্মসূচি নির্ধারণ করা ছিল ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই।
মাত্র বছরখানেক আগে ১১ জানুয়ারি ২০০৭-এ আমাদের সেই বাংলাদেশে আবারও একটি নীরব সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এই নীরব সামরিক অভ্যুত্থানের যোগান দিতে দেশের কথিত নাগরিক সমাজ বা ইউনূসঅনুসারীরা ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তাদের সেই ভূমিকার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে এগিয়ে আসে সামরিক বাহিনী। দেশ জুড়ে মাতম তোলা হয়, আমরা আর ১১ জানুয়ারির আগে ফিরে যেতে চাই না; বাংলাদেশ এবার Ôইউনূস-যুগেÕ প্রবেশ করেছে, এইবার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হবে, বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে, তথ্যঅধিকার পাওয়া যাবে, নারীর সমানাধিকার পাওয়া যাবে, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে… ইত্যাদি ইত্যাদি।
দেশের মানুষ এসব কথায় আশ্বস্ত হোক বা না হোক, দেশের কয়েকটি মিডিয়া অবশ্য এরকম সংবাদই পৌঁছে দিচ্ছিল দেশবাসীর কাছে। আর সেসব মিডিয়ার ওপর আস্থাশীল শহুরে মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশও খুব আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন।
এইসব মধ্যবিত্ত এখন ক্লান্ত ও অবসন্ন। কেননা ছদ্দবেশি সামরিক শাসনের গর্ভে সুশীল নাগরিকদের জান্তব প্রগতিশীলতা কোনও স্বস্তির জন্ম দিতে পারে নি। দেশে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয় নি, বরং আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি আর ঘুষ নিয়ে গবেষণাকারীরা,- যাদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই সামরিক-তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ÔজেহাদÕ ঘোষণা করেছেন। এরকম এক ÔজেহাদেÕর ফল এই যে, সম্প্রতি ইকনোমিস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের রংপুরে ন্যায্যমূল্যের চালের সারিতে দাঁড়ানো নিঃস্ব দিনমজুরকে এখন বলতে শোনা যাচ্ছে, Ôআমাদের রাজনীতিকরা দুর্নীতিবাজ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের সময়ে আমাদের হাতে চাল কেনার মতো টাকাও ছিল!Õ বছর শেষে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি আইনশৃঙ্ক্ষলাবিষয়ক যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন তা থেকেও দেখা যাচ্ছে হত্যা-সন্ত্রাসও সেই আতংকধর চারদলীয় জোট সরকারের সময়ের মতোই আছে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য এত বেড়ে গেছে যে একদা এ সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মধ্যবিত্ত পুরুষরা মুখ চুন করে তাদের বউদের পাঠাচ্ছেন মুখে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে বিডিআর পরিচালিত ন্যায্যমূল্যের দোকানের সারিতে দাঁড়ানোর জন্যে। আর এইসব মিডিয়া, যেগুলি আগবাড়িয়ে কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পার্লামেন্ট হয়ে উঠেছিল এবং সেই পার্লামেন্ট হিসেবে টিকে থাকার জন্যে এক ব্যারিস্টার ও প্রাক্তন উপদেষ্টা এবং অধুনা মৃত এক খতিবকে মধ্যস্থতাকারী মেনে মৌলবাদীদের সামনে নতজানু হয়ে মাফ চাইতে গিয়েছিল, তারাও এখন বিভিন্ন প্রতিবেদন লিখে যুদ্ধাপরাধী বিচার ও নারীনীতির সপক্ষে দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার।
বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো ১৯৮৩ সালে লিখেছিলেন, Ôমিলটন ফ্রিডম্যানের তত্ত্বসমূহ তাঁকে দিয়েছিল নোবেল পুরস্কার আর চিলির জনগণকে দিয়েছিল জেনারেল পিনোচেট।Õ বাংলাদেশেও একজন মানুষ ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান এবং তারপরই দাবি তোলেন চট্টগ্রাম বন্দর বেসরকারিকরণ করার। আর এই দাবি তোলার মধ্যে দিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন ফ্রিডম্যানের বিশ্বস্ত অনুসারীরা এবার দানবীয় শক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। তবে এই দানবের দল আসছে বেসামরিক পথ ধরে, যাতে সামরিক শাসনবিরোধিতায় অভ্যস্ত এদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করা যায়। কেননা অর্থনীতিতে মুক্তবাজারউপযোগী সংস্কার আনার জন্যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা করার পরিচিত পথটি আর কিছুতেই অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পক্ষে। অতএব জন্ম নিলো একজন সামাজিক বাণিজ্যবাদী, জন্ম নিলো সামাজিক বাণিজ্যতত্ত্ব। তিনি এমনকি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কথা বললেন। কিন্তু মুর্খ আমরা বুঝতে পারলাম না, ফ্রিডম্যানও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন এবং শিকাগো স্কুলপন্থী অর্থনীতিবিদদের কাছে কম্যুনিস্টদের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হলো কেইন্সপন্থী পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা।
নোবেলবিজয়ীর পাশাপাশি একজন পূর্ণাঙ্গ জেনারেল পেতে অবশ্য আমাদের একটু দেরি হলো, কেননা পূর্ণাঙ্গ কোনও জেনারেলই ছিলেন না বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে। অতএব ১১ জানুয়ারির পর প্রথম সুযোগেই এ পদটি সৃষ্টি করা হলো। এবং আমরা একজন পূর্ণাঙ্গ জেনারেলের মুখ দেখলাম। সুশীল নাগরিকরাও এতে প্রীত হলেন, পদায়নের শক্তি তাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হলো। একজন সম্পাদক দূরদর্শনে গলা তুলে ঘোষণা করলেন, Ôএই সরকারকে আমরাই এনেছি। এই সরকারকে ব্যর্থ হতে দেয়া যায় না।Õ বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও একই স্বরে কথা বলতে শুরু করলেন। মিডিয়া এবং রাজনীতিকদের প্রচণ্ড হাততালির মধ্যে দিয়ে ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, আমি তোমায় মারব না বলতে বলতে আমাদের প্রতিটি আপদে-বিপদে পাশে এসে দাঁড়াতে লাগল সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারোলিনায় যেমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেখানকার কর্পোরেটবাদীদের সামনে নতুন করে কর্পোরেটস্বার্থ বিন্যস্ত করার সুযোগ এনে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলিও সামরিকতন্ত্রকে একের পর এক নতুনভাবে বিন্যস্ত হওয়ার সুযোগ এনে দিলো। সামরিকতন্ত্র বিশ্বসাম্রাজ্যবাদীদের দাওয়াই অনুযায়ী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্পোরেটদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে থাকল অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে চলল পূর্বঐতিহ্যিক পথে,- ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তি সংঘবদ্ধ করার পথে,- যে পথের দিশারী ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান।
মঈন উ আহমেদ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতিতে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ পাঠের সময়েই জানিয়ে দিলেন, ধর্মের নৈতিকতা দিয়ে রাজনীতির কলুষ দূর করতে হবে। চতুর্দশ শতাব্দীতে আধুনিক রাষ্ট্রবাদীরা যে ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছিল, সেই ধারণা প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলল সামরিক বাহিনী পরিচালিত শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু এ-দিকটি আমাদের নাগরিক ও রাজনীতিকদের চোখেই পড়ল না। কেননা তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মঈন উ আহমেদ কথিত মুক্তিযুদ্ধ তত্ত্ব নিয়ে। তারা মনে করলেন এইবার দেয়ালে শেখ মুজিবুর রহমানের পাশ থেকে জিয়াউর রহমানের ছবি খসে পড়বে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। বাস্তবে দেয়ালে আরও অনেকের ছবি উঠল। যদিও সেই ছবির ভিড়ে এমনকি তাজউদ্দিনের মতো মুক্তিনায়কও কল্কে পেলেন না। এমনকি এখনও সুশীল নাগরিক ও মধ্যবিত্তদের অনেকে বুঝতে চাইছেন না, জিয়াউর রহমান যেমন সোভিয়েতপন্থী ও চৈনিকপন্থী রাজনীতিকদের সঙ্গে নিয়েও শেষ পর্যন্ত স্বার্থসংরক্ষণ করেছিলেন মৌলবাদী ধর্মজ রাজনীতিকদের, তেমনি এই সামরিক বাহিনী পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও প্রতিটি কথিত প্রগতিশীল কাজ সম্পন্ন করার নামে সামরিকতন্ত্র ও প্রতিক্রিয়াশীলতাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করে চলেছেন।
প্রচণ্ড সাফল্যও অর্জন করেছেন তারা তাদের এজেন্ডাগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। একেবারেই গর্হিত ও দৃষ্টিকটূ দেখায় বলে (তা ছাড়া সামরিক শাসন বৈধ করার শেষ আশ্রয়ও বটে!) প্রধান বিচারপতি হিসেবে কোনও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব না হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে। সম্ভব হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে একজন সেনাকর্মকর্তাকে অধিষ্ঠিত করা, যিনি দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কেই ভিন্নমত পোষণ করেন। নির্বাচন কমিশনের মতো স্পর্শকাতর জায়গাটিতেও সেনাকর্মকর্তা কাউকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করা না গেলেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োজিত হয়েছেন এমন একজন সেনা কমর্কর্তা, যিনি চাকরিজীবনে গমচুরির দায়ে সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং সারা দেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণের পর জোট সরকারকে জঙ্গিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে সৎপথে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই গমচুরির কাহিনী প্রকাশিত হয় দৈনিক সমকালে, কিন্তু এ কাহিনীকে ঢাকবার জন্যে দৈনিক প্রথম আলো ত্বরিৎগতিতে খবর ছাপে,- দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তাঁর সম্পত্তির হিসেব দিয়েছেন! দেশের কারাগারগুলির মূল দায়িত্বেও এখন রয়েছেন সেনাকর্মকর্তা। প্রশাসনের সবখানে এখন অঞ্চলপ্রতিনিধি বিভিন্ন সামরিক কর্মকর্তাদের তুমুল দাপট। আর Ôজনস্বার্থেÕ সামরিক বাহিনীর প্রধানের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আরও এক বছর। প্রতিটি আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক শিক্ষক ও সামরিক প্রতিনিধিদের মতবিনিময় কেন্দ্রে, প্রতিবাদকারী ছাত্র-শিক্ষকদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে অব্যাহতগতিতে।
প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচিত অনেকেই এখন তাদের সারা জীবনের গৌরব এরকম সব অপচেষ্টার পেছনে ব্যয় করতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। যেমন, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী ড. আনিসুজ্জামান গত আগস্টে ছাত্রনির্যাতনের প্রতিবাদকারী শিক্ষক ও ছাত্রসমাজকে বিপথগামী করতে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় কলম ধরেন, লেখেন : Ôএ পরিস্থিতিতে শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ সঙ্গত হয়েছে। তবে সমিতির বক্তব্য ঘটনার প্রতিবাদ অতিক্রম করে রাজনৈতিক অবস্থান সূচিত করেছে। এর দায়দায়িত্ব সমিতিকেই বহন করতে হবে। সমিতির পক্ষে এরকম রাজনৈতিক অবস্থান অবশ্য নতুন নয়, অতীতেও এমন হয়েছে। তবে সান্ধ্য আইন জারির পর ছাত্রছাত্রীদের হলত্যাগের নির্দেশ অমান্য করতে যদি শিক্ষক সমিতি আহ্বান জানিয়ে থাকে, তবে তা যথার্থ হয়নি। ছাত্রছাত্রীরা যদি নির্দেশ অগ্রাহ্য করে থেকে যেতো এবং পরিণামে আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানির সম্মুখীন হতো, তার দায়িত্ব কে বহন করতো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে এমন হয়রানির ঘটনা যে ঘটছে তা তো আমরা জানতেই পারছি।Õ
কী চমৎকার ব্যাপার! সেনাসদস্যদের নির্যাতনকে নির্যাতন বলার মতো সাহসই হলো না ড. আনিসুজ্জামানের, তিনি বরং মোলায়েমভাবে সামরিক সেনাদের গায়ে তেল-মলমই মালিশ করলেন সেটাকে Ôহয়রানিÕ বানিয়ে (অথবা আদর্শিক ও নৈতিকভাবে তিনি সেরকমই মনে করেন)। এবং ÔযদিÕ শব্দটির ওপর নির্ভর করে শিক্ষক সমিতির বিরুদ্ধে ড. আনিসুজ্জামান তাঁর ক্ষোভ উগড়ে প্রতিনিধিত্ব করলেন নির্যাতক সামরিক কর্মকর্তাদের। কথার কথা, ধরা যাক, ছাত্রছাত্রীরা সেদিন রাতে হলেই অবস্থান নিলো। কী হতো তা হলে? আরও একটি ২৫ মার্চ ১৯৭১? তার মানে আমাদের সামরিক শাসকদের সেই যোগ্যতা রয়েছে, যেমন ছিল পাক-সামরিক বাহিনীর? সোজাভাবে আনিসুজ্জামান সেটি আমাদের জানিয়ে দিলেই পারতেন, এত ঘুরিয়ে বলার দরকার কী, বলুন? নাকি মঈন উ আহমেদের মতো তিনিও দুঃখ পান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করতে? আমাদের জানা নেই। তবে আমরা আরও কিছুদিন পর দেখতে পেলাম, শিক্ষক-ছাত্র-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন মহল যখন জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা ছাড়াই ফ্রান্সে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ পাঠানোর বিরোধিতা করছেন তখন ড. আনিসুজ্জামান আবারও আবির্ভূত হয়েছেন, সংবাদসম্মেলনে সাফাই গাইছেন,- গিমে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে প্রত্নতত্ত্ব পাঠানো উচিত!
আগস্ট ২০০৭ এই শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেক ভড়ং-ই উন্মোচন করে দিয়েছে। তারা সেনাক্যাম্প রাখতে চেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকারান্তরে বনবন করে মুগুর ঘুরাতে ঘুরাতে তারা বলছিল : হাতে আমার মুগুর আছে, তাই কি হেথায় থাক্বে না?/ মুগুর আমার হালকা এমন মারলে তোমার লাগবে না। কিন্তু তাদের সেই অভয়ে কাজ হয় নি বলে তারা সত্যিই আমাদের ঠ্যাং চেপে ধরেছিল, মুণ্ডু চেপে বসেছিল। তারপর Ôতিনি, তার গিন্নি এবং তাদের নয় ছেলেÕ অর্থাৎ সামরিক শাসক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা সবাই মিলে কামড়াতে শুরু করেছিল,- শাহবাগের আজিজ মার্কেট থেকে শুরু করে সেদিনের গোটা বাংলাদেশই তার সাক্ষী।
এই সামরিকতন্ত্র পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আমার সুযোগ হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এর মাঝামাঝি একুশ উপলক্ষে একটি রাজনৈতিক দল আয়োজিত সেমিনারে বিভিন্ন বামনেতা ও কর্মীদের উপস্থিতিতে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের (পরে যা ছাপা হয়েছিল দৈনিক সমকাল, সাপ্তাহিক একতা ও সাপ্তাহিক নতুন দিনে)। তাতে আমি এরকম লিখেছিলাম, একটি দেশে কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে জরুরি শাসন এলে সেখানকার সাধারণ মানুষ উল্লসিত হলেও হতে পারে, কিন্তু দেশের সচেতন বুদ্ধিজীবী ও নাগরিকরাও যখন উল্লসিত হন তখন সত্যিই আমাদের জন্যে দুর্দিন অপেক্ষা করছে। আমি লিখেছিলাম, দেশে এবার ব্যক্তি-দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বদলে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের পথ আরও খুলে দেয়া হবে, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি-সন্ত্রাস আরও প্রাতিষ্ঠানিকতা পাবে; আর দেশটিকে কর্পোরেট সামাজিক বাণিজ্যবাদীদের রাজত্বে পরিণত করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে।
কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক গ্রেফতার হওয়ার আনন্দে আমাদের অনেকেই তখন ছিলেন আত্মহারা। তারা ইতিহাসবিস্মৃত হয়েছিলেন, ভুলে গিয়েছিলেন প্রতিটি সামরিকতন্ত্রই ক্ষমতা দখলের পর দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করার মধ্যে দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা তৈরি করে এবং পরে আবার এই দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদেরই আত্তীভূত করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। তারা ভুলে গিয়েছিলেন, প্রতিটি সামরিকতন্ত্রই ক্ষমতা দখলের পর Ôপ্রথমে জানোয়ারটার গায়ে দুর্গন্ধ লাগিয়ে দাও, তারপর ওটাকে গুলি করে মারোÕ তত্ত্ব অনুসরণ করে, যাতে আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা আছে যেসব কেন্দ্রগুলি থেকে, সেগুলিকে তছনছ করে দেয়া যায়।
এবং এভাবেই সব কিছু তছনছ করা হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলিকে নয়, আমাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধারণাগুলিকেও। বায়তুল মোকাররম থেকে যারা Ôনারায়ে তকবিরÕ ধ্বনি দিয়ে বেরিয়ে আসছে তাদের জামাইআদরে রাজপথ ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় বামপন্থীদের মুক্তাঙ্গন থেকে মিছিল করার পথে বাধা দেয়া হচ্ছে, হামলা করা হচ্ছে। আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল। এই স্বাধীনতা কতটুকু দেয়া হয়েছে, বিচার বিভাগ অবমাননার ভয়ে কারোরই সাহস নেই তা নিয়ে প্রাণ খুলে আলোচনা করার। আমাদের তথ্যঅধিকার আইনের ¯^cœ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেই তথ্যঅধিকার আইন বাস্তবে কতটুকু তথ্য জানার অধিকার দেবে, তথ্য জানানোর জন্যে দায়বদ্ধ করবে, সে-সম্পর্কে এর মধ্যেই আমাদের চোখ খুলে গেছে। বিটিভিÕর চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তথ্যস্বচ্ছতার প্রতি এ-সরকারের কত দরদ! এ-সরকারের প্রতি সবচেয়ে সহৃদয় সম্পাদক-সাংবাদিক মতিউর রহমানও এখন বিটিভি নিয়ে উদ্বিগ্ন। যুদ্ধাপরাধী শব্দটি জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে,- যাতে ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তিই-যে মূলত যুদ্ধাপরাধী ছিল, রাজাকার, আলশাম্স ও আলবদর ছিল, সেটি আমরা ভুলে যাই ক্রমান্বয়ে| এবং যাতে এইভাবে ধর্মীয় রাজনীতির একটি স্বচ্ছ গ্রহণযোগ্য অবয়ব তৈরি করা যায়। সবচেয়ে কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নারীনীতি নিয়ে। ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তি বলছে, সমানাধিকারের কথা বলা যাবে না, বলতে হবে নারীর ন্যায্য অধিকারের কথা। সামরিকতন্ত্র পরিচালিত সরকার এর মধ্যেই ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তির উত্থাপিত এরকম সব দাবি পর্যালোচনা করার জন্যে একটি কমিটিও তৈরি করেছেন। এবং আমাদের প্রকারান্তরে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, ন্যায্য অধিকার আর সমানাধিকারে অনেক তফাৎ, ন্যায্য শব্দটির মধ্যেও শোষণের দিক রয়েছে এবং সেই শোষণমূলক দিকটি বহাল রাখার ব্যাপারে এ সরকার বদ্ধপরিকর।
আমরা জানি না, ভবিষ্যতে আমাদের জন্যে আরও কত কী অপেক্ষা করছে। তবে এটুকু এর মধ্যেই পরিষ্কার, এদের কাছ থেকে পাওয়ার কোনও কিছুই নেই। এই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করা আর ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করা, রাজনীতিতে সামরিকতন্ত্রের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ করা সমান কথা। যারা এতদিন এদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, এদের উত্থাপিত একেকটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশংসা ও আলোচনা করেছেন এবং এইভাবে সময় নষ্ট করেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির পথ রুদ্ধ করেছেন এবং কথিত Ôগোপন ক্ষুধাÕর মতো Ôগোপন দুর্নীতিÕ ও Ôগোপন সন্ত্রাসেÕর রাজত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন তাদের সম্পর্কেও সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার।
কেননা আমরা জানি, পৃথিবীতে কিছু কিছু অপশক্তি বার বার নতুন করে জন্ম নিতেই থাকে, বার বার তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়। আমাদেরও সময় এসেছে নবোদ্যমে ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তি ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে, কর্পোরেট অর্থনীতিবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। এর কোনও বিকল্প নেই।
বিধবা সময়ের গল্প
হাসান আজিজুল হক-এর সাম্প্রতিকতম গল্পের বই ‘বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প’ নিয়ে লেখা একটি আলোচনা,- যাতে প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে এসেছে হাসানের লেখার সাম্প্রতিক গতিপ্রবণতা। এ লেখাটি সম্প্রতি ছাপা হয়েছে বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম-এর আর্টস বিভাগে।
-
সাম্প্রতিক
- আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ
- বিদায় স্বায়ত্তশাসন ও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা?
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, তৃতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব
- শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার : সামান্য মুখবন্ধ
- বিধবা সময়ের গল্প
-
Links
-
আর্কাইভ
- জুলাই 2008 (2)
- জুন 2008 (4)
- মে 2008 (2)
-
বিভাগ
-
RSS
Entries RSS
Comments RSS

