বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
পাঁচ.
খাদ্যমূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের কর্পোরেটবাদী মিডিয়াগুলো ব্যাপারটির অপরিহার্যতা ও অনিবার্য ভয়াবহতা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশন করতে লাগলেন। কিছু দৈনিকের কর্পোরেট-কলামিস্টরা এ ব্যাপারে তাদের কলমের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন (হয়তো তাদের অনেকের আন্তরিকতাও আছে, হয়তো তারা বলিভিয়ার প্রক্রিয়াকেই সংকট থেকে উত্তরণের সঠিক প্রক্রিয়া মনে করেন!)। কর্পোরেট কলামিস্টদের কারও কারও মতে, উপদেষ্টা পরিষদের কেউ আসলে ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি। কিন্তু না, তারা ব্যাপারটি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। অর্থনীতির ছাত্র ফখরুদ্দিন আহমদ, এবি মীর্জ্জা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম আর হোসেন জিল্লুর রহমানদের যদি আমরা অবোধ ও নির্বোধ মনে করি, তা হলে তা হবে এ জগতের চিরকালীন সেরা কৌতূক। বরং পরিস্থিতি যাতে ভালোমতো তালগোল পাকায় সে জন্যেই সরকারের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের খাদ্যমজুত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ভারত থেকে চাল আমদানির ব্যাপারে সঠিক সময়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ ছিলেন এবং শুধু তাই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় যে-চাল এসেছিল পাকিস্তান থেকে তা ভালো হওয়ার পরও খারাপ বলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছিল।
এসব কিছুরই তত্ত্বাবধান করছেন আমাদের দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত, ঝানু ও দক্ষ অর্থনীতিবিদরা। আর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। এখন যে আবার মাটির নিচ থেকে চাল তুলে আনা হচ্ছে তারও হয়তো কারণ আছে। হয়তো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন কর্পোরেটবাদীদের।
এতে কোনও সন্দেহ নেই, মধ্যনব্বইতে বলিভিয়াতে যে শক থেরাপী বাজার কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, তারই খেলা চলছে বর্তমানে বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের পর এখানে রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানদের মতো অর্থনীতিবিদরা যে-ধরনের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা এখন একেবারেই সুদূরপরাহত। যদিও ফখরুদ্দিন আহমদ, হোসেন জিল্লুর রহমানরা উপদেষ্টা বনে যাওয়ার পর গুরুদক্ষিণা দিয়েছেন, রেহমান সোবহানকে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পদক ২০০৮ দিয়েছেন, কিন্তু তা আসলে নেহাৎই কৃতজ্ঞতাবশত,- কেননা এদের কেউই আর রেহমান সোবহানের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন না। সাশ যেমন কেইন্সের ভক্ত হওয়ার পরও কেইন্সকে পায়ে দলে এগিয়ে গেছেন, এরাও তেমনি রেহমান সোবহানের ছাত্র হওয়ার পরও রেহমান সোবহানের ধারণাগুলো অগ্রাহ্য করে চলেছেন। এখনও আমাদের সংবিধান বলছে, পরিকল্পিত অর্থনীতি অনুযায়ী দেশ চালানোর কথা (বোধহয় সংবিধানসংশোধনকারী রাজনৈতিক সরকারগুলো এ ব্যাপারটিকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন নি), কিন্তু সরকার বলছে বাজার মৌলবাদের কথা, মুক্ত বাজারের কথা।
এবং তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর থেকেই আমরা দেখছি, মধ্যনব্বইতে বলিভিয়ায় যে ব্যর্থ বাজারকৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, বাংলাদেশেও সেই বাজার কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। জাতীয়করণকৃত পাটশিল্পগুলি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে সেগুলি ব্যক্তিমালিকানায় পুনরায় চালু করার। দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে অব্যাহতগতিতে,- যদিও কর্পোরেটপন্থী মিডিয়াগুলি বারবার জনঅসন্তোষ স্তিমিত করার জন্যে অদ্ভূত সব প্রতিবেদন প্রচার করেছেন, কখনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলোকে দোষারোপ করেছেন, কখনো উপদেষ্টাদের অজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাবের সমালোচনা করেছেন; কিন্তু সবসময়েই আড়ালে রেখেছেন এ দেশীয় শক থেরাপীর প্রণেতা অর্থনীতিবিদদের। জ্বালানিতেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছিল গত এপ্রিল ২০০৭-এ আর সবশেষে সিএনজির মূল্য একলাফে দ্বিগুণ করা হয়েছে এপ্রিল ২০০৮-এ। ১০ এপ্রিল ২০০৮-এ অর্থ উপদেষ্টা এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিদেশ থেকে ফিরেই ঘোষণা দিয়েছেন, আবারও তিনি বাড়াবেন জ্বালানিতেলের দাম। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যমূল্য হু হু করে বেড়েছে আরেক দফা। এসবই শক থেরাপী। আপনি তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠবেন, কিন্তু বুঝতেও পারবেন না এটি আসলে যন্ত্রণা কি না; এবং তারপর হঠাৎ নিথর হয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। একটু পর জেগে উঠবেন, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কী হচ্ছে বোঝার আগে আবারও তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে বোধহীন হয়ে পড়বেন।
কর্পোরেটবাদীরা ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল খাত কৃষি এবং সেটিকেই তাদের টার্গেট করা দরকার। দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটানোর নামে আগে থেকেই এখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা চুক্তিভিত্তিক কৃষি শুরু হয়েছিল। এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার উদ্যোগ নিয়েছেন এটিকে আরও উৎসাহিত করার। আগামী ২০০৮-০৯ সালের বাজেটে চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে সরকারের। এই সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে কর অবকাশ সুবিধা, কমসুদে ব্যাংক ঋণসহ বীমা সুবিধা দেয়া ইত্যাদি। যেসব সুবিধা তারা কৃষককে দিতে নারাজ সেইসব সুবিধা ফার্মিং কোম্পানিকে দিতে সরকারের কোনও কুণ্ঠা নেই। যেমন, কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ছে। তবে এমন কৌশল খাটানো হচ্ছে, যার ফলে কৃষি ভর্তুকি পাবে মূলত কন্ট্রাক ফার্মগুলি। কৃষকরা ভর্তুকি পাক বা না-পাক কিছু আসে যায় না, কিন্তু এসব ফার্মকে ভর্তুকি দিতেই হবে।
কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর পরিকল্পনা নিয়ে যারা এগিয়ে আসছে, সেসব ফার্মিং কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বহুল আলোচিত ব্র্যাক। রয়েছে সুপ্রিম সীড। রয়েছে আগোরা। রয়েছে মীনাবাজার। আরও রয়েছে এনসিসি ব্যাংক ও বোম্বে সুইটস অ্যান্ড চানাচুর। এদের মধ্যে ব্র্যাক বীজের ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করছে এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্র্যাকের কৃষিচিন্তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। কিন্তু সরকারের কাছে এসব প্রশ্ন মোটেও বড় নয়। বড় হলো কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর মধ্যে দিয়ে সাশ-কথিত কাঠামোগত সহায়তা দেয়ার পথটি প্রশস্ত করা। কৃষক ¯^vaxb থাকবে কি না তা বড় ব্যাপার নয়, বড় ব্যাপার হলো কৃষককে নতুন করে দাস বানানো। মানুষ মারা যাবে নাকি বেঁচে থাকবে সেটি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। মানুষের পকেটে টাকা থাকবে কি থাকবে না সেটি চিন্তার ব্যাপার নয়, চিন্তার ব্যাপার হলো মুদ্রাস্ফীতি কমানো।
ছয়.
গত এক বছর ধরে শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে যে শক থেরাপী প্রয়োগ করে আসছেন, তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা সামান্য একটু ধারণা পেতে পারি সমপ্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তুলে ধরা কিছু তথ্য থেকে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বা শক থেরাপী বাজারকৌশল প্রয়োগ করার আগে এখানে ছয় কোটি গরীব মানুষ ছিল, যাদের মধ্যে হতদরিদ্র ছিল সাড়ে চার কোটি মানুষ। মাত্র এক বছরের মধ্যে এই সরকারের কল্যাণে মধ্যআয়ের শ্রেণীপরিধি সংকুচিত হয়েছে; গরিব মানুষের তালিকায় নেমে এসেছেন সেখান থেকে চার কোটি মানুষ। এখন তাই এখানে গরিব মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি আর এদের মধ্যে হতদরিদ্র মানুষ হলেন ছয় কোটি। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সহসভাপতি সাবেক কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল সৈয়দ ইউসুফের এই গবেষণাপ্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত ১৫ মাসে বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। অথচ মানুষের আয় বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ৭০ শতাংশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। উন্নত দেশগুলির অধিবাসীরা নিত্যপণ্য কিনতে ব্যয় করেন তাদের আয়ের আট শতাংশ। আর বাংলাদেশের এই দরিদ্র মানুষজনকে তাদের মোট আয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যয় করতে হয় নিত্যপণ্য কিনতে। এদের প্রকৃত আয় গত একবছরে কমেছে ৪৫ শতাংশ। এই মানুষরা কাপড়চোপড় কিনবে কোত্থেকে? মাথা গোঁজার ঠাঁই তুলবে কোত্থেকে? সন্তানকে স্কুলে পাঠাবে কেমন করে?
তারপরও গার্মেন্টসের শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করে, তখন তার মধ্যে আমরা বিদেশীদের চক্রান্ত দেখি। সাধারণ মানুষ যখন ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়েছে দেখে আশায় বুক বাধে আর ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে শামিল হয় তখন আমরা তাতে সরকারকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র দেখি। মিডিয়ার লোকজনকে দেখি এই সরকারের ওকালতি করে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও কলাম লিখতে। আমাদের কি কোনও লজ্জাই নেই?
সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে কোনও দুর্ভিক্ষ নেই, বড় জোর হিডেন হাঙ্গার রয়েছে। তা হিডেন হাঙ্গারই বটে। সরকার তো রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। কী করে এই দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষরা জানাবে তাদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধার কথা? সরকার তো মিডিয়ার ওপর খবরদারি করছেন, স্তাবকদের লেলিয়ে দিয়েছেন শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুণগান গাইতে। কে তুলে ধরবে এই দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষদের ক্ষুধার কথা?
আর কেইবা তুলে ধরবে এই কর্পোরেটবাদীদের নগ্নক্ষুধার নগ্নতা? বলিভিয়ার যে সর্বনাশা শক থেরাপীর কথা লিখেছি, সে সম্পর্কে বলিভিয়ার জনগণ সর্বপ্রথম জানতে পারে আগস্ট ২০০৫ সালে, সেখানকার সাংবাদিক সুসান ভেলাসকো পোরটিল্লো অনেক অনুসন্ধান চালিয়ে গনির অর্থনৈতিক টিমের সদস্যদের সাক্ষাৎকার আদায় করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাঁড় করানোর পর। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এখানকার বড় বড় মিডিয়াভবনগুলি কর্পোরেটপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে; এখানকার নামকরা কলামিস্টরা আসলে কর্পোরেট-কলামিস্ট। তারা অনেক কড়া কথা লিখতে পারেন, কিন্তু সেই কথা কথার কড়া কলাম কখন ছাপা হবে তা নির্ভর করে কর্পোরেটচক্রের ওপরে।
সুসানের মতো একজন সাংবাদিকের দেখা আমরা কতদিনে পাব! তার প্রতিবেদনটি ছাপানোর মতো একটি পত্রিকা আমরা কতদিনে পাব? কতদিন পর কত অনাহার ও মৃত্যুর বিনিময়ে, কত গৃহহীনতা ও অধিকারহীনতার বিনিময়ে আমরা মেটাতে পারব কর্পোরেটবাদীদের এই নগ্নক্ষুধা!?
তথ্যসূত্র :
এ কে গুপ্ত : মার্কেট ম্যাডনেস, জি-ম্যাগাজিন, জুন ২০০৮ সংখ্যা।
নাওমি ক্লেইন : দ্য শক ডকট্রিন, অ্যালেন লেন, ইংল্যান্ড, ২০০৭।
রাজ প্যাটেল : স্টাফড অ্যান্ড স্টার্ভড : দ্য হিডেন ব্যাটল ফর দি ওয়ার্ল্ড ফুড সিস্টেইম, যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৮।
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, তৃতীয় পর্ব

চার.
স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, কর্পোরেটবাদীদের চোখ পড়েছে এশিয়ার কৃষিবাজারের দিকে। আর খাদ্যবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ার অন্যতম কারণ এটাই। তারা চান কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের বাজারকে নতুনভাবে বিন্যাস করতে। চান কৃষিপণ্যের বাজারকে কর্পোরেটবাদীদের উপযোগী করে তুলতে।
তবে কোনও কোনও দেশকে তো গিনিপিগ হতে হবে। বাংলাদেশ হলো সেই গিনিপিগ, কর্পোরেটবাদীদের কর্পোরেটতন্ত্র পরীক্ষানিরীক্ষার এশিয় গবেষণাগার। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক শাসন প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি, সংগঠিত বামআন্দোলন গড়ে না উঠলেও বুর্জোয়া রাজনীতি প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীল আর পুঁজিবাজারও সুগঠিত নয়। তা ছাড়া এখানে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহও বিকশিত হয়নি যথাযথভাবে। বাজারব্যবস্থাও খুবই দুর্বল। অথচ অন্যদিকে বাংলাদেশের মাটি এতই উর্বর আর কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই এখানকার কৃষি উৎপাদন এত সন্তোষজনক যে এরকম সোনার খনি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার মতো বোকামী আর হতে পারে না। আর চীন ও ভারতের জনবহুল বাজারের দিকে তাকিয়ে লোভাতুর হওয়া যায়, কিন্তু তাদের তো গিনিপিগ বানানো সম্ভব নয়।
অবশ্য, এশিয়ায় না হলেও, বিশ্বব্যাপী কৃষিবাণিজ্য অনেক আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে আসছে কর্পোরেটবাদীরা। ১০টি মুখচেনা বহুজাতিক কোম্পানী নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের চালগমসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনের বীজবাজারের ৫১ শতাংশ। এ ১০টি কোম্পানীর সমগ্র ব্যবসার ৭০ শতাংশ আবার নিয়ন্ত্রণ করছে তাদেরই চারটি কোম্পানী। এদের নাম মোটামুটি সবারই জানা। এরা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের মনসানতো ও দুপন্ট, সুইজারল্যান্ডের সিনজেনটা এবং ফ্রান্সের গ্রুপে লিমাগারিন। অনেকেই জানেন, বাংলাদেশের মহান নোবেল শান্তিবাজ ড. মুহম্মদ ইউনূসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মনসানতো কোম্পানির সঙ্গে।
পৃথিবীজুড়ে খাদ্যসামগ্রীর খুচরা বাজারের এক-চতুর্থাংশ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ ১০টি খাদ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। এই ১০টি কোম্পানীর সমগ্র বাজারের ৬৫ শতাংশ রয়েছে আবার আমেরিকার ওয়ালমার্ট, ফ্রান্সের কোরেফুর, জার্মানীর মেট্রো এজি এবং নেদারল্যান্ডসের আহোলন্ড-এর নিয়ন্ত্রণে।
উন্নত দেশগুলি কৃষিভর্তুকি দিয়ে তাদের কৃষিখাতকে শক্তিশালী করে রেখেছে। আবার কৃষিপণ্যের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে এসব দেশেরই হাতেগোণা বাণিজ্যিক কোম্পানীগুলো। এসব বাণিজ্যিক বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই উন্নয়নশীল ও ¯^‡ívbœZ আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় তুঙ্গে উঠেছে। কেননা এসব বহুজাতিক বাণিজ্যিক কোম্পানীগুলোই মূলত কৃষিবাণিজ্যে বৈষম্যমূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধির সুবিধা নিচ্ছে। আর উন্নত দেশগুলোর কৃষিভর্তুকির সুবিধাগুলোও সেখানকার কৃষকদের বদলে মূলত লুটে নিচ্ছে এসব কোম্পানীগুলো।
এই কোম্পানিগুলো এখন চাইছে বিশ্বের যেসব দেশের কৃষিবাজার তাদের তত্ত্বউপযোগী নয়, সেসব দেশের কৃষিবাজারকে তেমনটি করে তোলার।
এপ্রিল ২০০৮-এর মধ্যেই এ বিষয়টি কারও কারও চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একে একে ভয়ংকর সব খবর আসতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টে ২৬ এপ্রিল ২০০৮-এ খবর বের হলো, চাল, গম, আটাসহ খাদ্যশস্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। আর এর ফলে বাংলাদেশ, ক্যামেরুন, ফিলিপাইনসহ বেশকিছু দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কেননা সেখানে দেখা দিচ্ছে সহিংসতা। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট বি যোয়েলিক বললেন, খাদ্যসংকটের কারণে বিশ্বের আরও ৩০টি দেশে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। আর হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বললেন বিশেষভাবে বাংলাদেশের কথা। বললেন, বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলির মানুষের খাবার কেনার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। এইভাবে বাংলাদেশ আলোচনার পাদপ্রদীপে চলে এলো।
যদিও ম্যানিলাভিত্তিক গবেষণাসংস্থা ইরির পক্ষ থেকে বলা হলো, এই সংকট মানবসৃষ্ট, কিন্তু কেউই সে কথা গায়ে মাখলেন না। বলা হতে লাগল, জৈবজ্বালানি উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট সৃষ্টি দেখা দিয়েছে। বলা হতে লাগল, এই সংকটের কারণ ভারত ও চীনের খাদ্যবাজার বেড়ে গেছে।
কিন্তু শক থেরাপী বাজারকৌশলের প্রধান শর্তই হলো, লোহা গরম থাকতে থাকতেই ছ্যাঁকা দিতে হবে। অতএব খুব দ্রুতই সুগঠিত প্রস্তাব এলো ২০০৬ সালে মিল্টন ফ্রিডম্যানের মৃত্যুর পর মুক্ত বাজারের নব্য পথিকৃৎ মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফ্রী সাশের পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, জরুরি সাহায্য দেয়ার কোনও মানে নেই। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার। এ রকম একটি প্রস্তাব যে আসবে সেটি অবশ্য অনুমান করা যাচ্ছিলো। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, খাদ্যসংকটগ্রস্থ আফ্রিকার দেশগুলিকে তারা সহায়তা করবেন, তবে আগের মতো করে নয়। এবার আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের জাহাজে করে খাদ্যসাহায্য পাঠাবেন না তারা। বরং আফ্রিকার যেসব দেশ খাদ্য উৎপাদন করে, সেসব দেশ যদি খাদ্য বিক্রি করে তা হলে সেই খাদ্য কেনার টাকা দিয়ে সহায়তা করবেন মাত্র।
আপাতদৃষ্টিতে জেফ্রী সাশের কথাবার্তা ও নীতিপ্রণালী খুবই নিরীহ। কিন্তু আসলে তা তত নিরীহ নয়। কেননা কাঠামোগত সহায়তা দেবে কর্পোরেটবাদীরা; আর তাদের কাছে চিরদিনের মতো বাঁধা পড়ে যাবে আমাদের মতো দেশগুলোর স্থানীয় কৃষি বাজার। এ পরামর্শের আরেকটি লক্ষ্য, জৈবজ্বালানীর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বসন্তে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আগামী ২০২০ সালের মধ্যে তারা পরিবহন ক্ষেত্রে জৈবজ্বালানির পরিমাণ ১০ শতাংশে উন্নীত করবে, যা আগামী ২০১০ সালের মধ্যে ৫.৭৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা আরও আগেই নেয়া হয়েছিল। জেফ্রী সাশ-রা এই পরিকল্পনাকে একদম সহ্য করতে পারছেন না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নয়ন কমিটির সামনে জেফ্রী সাশ বলেছেন, পৃথিবীব্যাপী খাদ্যমূল্যের ক্ষেত্রে যে সংকট দেখা দিয়েছে তা খাদ্য সরবরাহের রুদ্ধপ্রক্রিয়ার কারণে ঘটছে না; এ-অবস্থার জন্ম হয়েছে খাদ্যের ক্রমবর্ধিষ্ণু চাহিদা থেকে। পৃথিবীতে খাদ্যের এই সরবরাহ ও চাহিদাসংকটের কারণ, সাশ-এর মতে, দরিদ্র অঞ্চলগুলিতে খাদ্যউৎপাদন Ôযা হওয়া উচিত তার চেয়ে অনেক কম।Õ অতএব এইসব দেশে এমন কাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারে।
সাশ এখানেই থামেননি। তিনি তাঁর সাফল্যের উদাহরণও তুলে ধরেছেন। বলেছেন, পৃথিবীর একটি গরিব রাষ্ট্র মালোয়িতে এ ধরনের কাঠামোগত সহায়তা দেয়া হয়েছে এবং গত তিন বছর ধরে সেখানে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হচ্ছে। তিনি বলেছেন, প্রকৃতির মতিগতি বোঝা বড় দায় হয়ে পড়েছে। অতএব অর্থায়ন করতে হবে মূলত এমন ধরণের বীজ উদ্ভাবনী গবেষণার ক্ষেত্রে, যে ধরনের বীজ খরা ও আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। অর্থাৎ কাঠামোগত সহায়তার নামে যা-যা করা হবে তার সব সুফলই ভোগ করবে কর্পোরেট সংস্থাগুলো।
আর মালোয়ির অবস্থা? আপাতত শুধু এটুকুই বলা যায়, মালোয়িতে শস্য উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে দরিদ্র কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে!
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
তিন.
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর দুর্নীতিতে আক্রান্ত রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার নামে প্রকাশ্যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়, নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়; কিন্তু সংগোপনে শুরু হয় বাজার পুনর্গঠনের কাজ। আর তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। হু হু করে জিনিসপত্রের মূল্য বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের কর্পোরেটপন্থী মিডিয়াগুলো এখনও ছবক দিয়ে চলেছে, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ার পেছনে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনও হাত নেই। কারণ, এসব মিডিয়াগুলোর প্রচারণার ভাষায় বলতে গেলে, Ôআন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোতে জ্বৈবজ্বালানি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রসারিত হয়েছে চীন ও ভারতের মতো জনবহুল দেশের খাদ্যবাজার। খাদ্যমূল্য বাড়ছে এসব কারণে।Õ শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে তারা আরও একটি সত্য জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে : Ôআগামী এক বছরের মধ্যে খাদ্যমূল্য কমার কোনও সম্ভাবনাই নেই এবং সস্তা খাবারের যুগ শেষ।Õ
আপাতদৃষ্টিতে এসব সত্যই বটে। সত্য শস্য-তালিকা ক্রমাগত কমে আসছে, এশিয়ায় পশুজাত সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে পৃথিবী জুড়ে জনসংখ্যা, বৈশ্বিক তাপমাত্রা, জৈবজ্বালানির চাহিদা, দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্যিক ফটকাবাজী, কমছে ডলারের দাম, প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে অশোধিত তেলের বাজারমূল্য, বিরূপ ভূমিকা রাখছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর নীতিসমূহ, আমদানি প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি সব কিছু। এসবের প্রতিটিই কোনও না কোনওভাবে পণ্যমূল্য বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
তারপরও দেখা যাচ্ছে, এ-সব সত্যের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। যেমন, জনবহুলতার হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম বড় বাজার ভারত ও চীনে। কর্পোরেট গবেষকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ দুটি দেশের মানুষদের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষত মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্যের মাধ্যমে। অথচ মানুষের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়াটা কোনও নতুন প্রবণতা নয়, দশকের পর দশক ধরে দেশকাল নির্বিশেষে এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এটি পুরোপুরি অস্বাভাবিক যে, ২০ থেকে ৩০ বছরের একটি স্থিতিশীল ও ধারাবাহিক বৃদ্ধিহারের বিপরীতে দু’এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাবে। উদাহরণত, ভারতে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৩-এর মধ্যে ব্যক্তিপ্রতি ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ১৫৩ ক্যালরি, তার মানে বছরপ্রতি ১২ ক্যালরির মতো; চীনে সেখানে মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ২৩১ ক্যালরি, অর্থাৎ বছরপ্রতি ১৮ ক্যালরি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১০ ক্যালরি। অর্থাৎ ক্যালরি গ্রহণের তারতম্য দিয়েই যদি পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণ দাঁড় করানো হয়, সে-ক্ষেত্রে দায়ী করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকেই। আবার শস্য-তালিকা ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে এলেও গেল বছর ফসল উৎপাদন অনেক বেড়েছে। আমাদের শোনানো হচ্ছে খাদ্য আর এনার্জি, এ-দুয়ের উত্তরোত্তর চাহিদা বাড়ার কথা আর সরবরাহে অনিয়মের কথা; কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় খরা হলেও, চীনে বরফপাত ও তুষারঝড় বয়ে গেলেও এবং মার্কিনী ব্রেডবাস্কেটে ঠাণ্ডা ও আর্দ্র শীত নেমে এলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। ইউএন খাদ্য ও কৃষি সংগঠন আমাদের তথ্য দিচ্ছে যে, বার্ষিক বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন ৯২ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে গিয়ে ২০০৭-২০০৮ সালে ২.১০২ বিলিয়ন টনে ঠেকেছে। তবে এই বৃদ্ধির প্রায় সবটাই ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে। আর যুক্তরাষ্ট্র সে-শস্য জৈবজ্বালানি শিল্পে যোগান দেয়ার তথ্য দেখাচ্ছে। তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু উদ্ঘাটন করা সত্যিই কঠিন যে সুপরিকল্পিত ফাটকাবাজী কীভাবে ঘটেছে। রাজ প্যাটেলের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর পশুদের খাওয়ানো হয়েছে ৭৪০ মিলিয়ন টন খাদ্য, যা দিয়ে বর্তমান সময়ের খাদ্যঘাটতিকে কমপক্ষে ১৪ বার ঠেকানো যেত। মূল্য বেড়ে যাওয়ার জন্যে জৈবজ্বালানি শিল্পবাদীরা আবার আগ্রহী চীনকে দোষারোপ করতে। গত এপ্রিল ২০০৮-এ তাদের পত্রিকা বায়োফুয়েল ডাইজেস্টস-এ একটি সমীক্ষা ছাপা হয়েছে এই শিরোনামে : Ôবৈশ্বিক শস্যঘাটতির কারণ চীনের মাংসব্যবহার।Õ অথচ ওই সমীক্ষাতেই দেখানো হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০০৭ এর মধ্যে চীনের মাথাপিছু মাংসচাহিদা বেড়েছে মাত্র সাত পাউন্ডেরও কম। একইভাবে এনার্জি চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে তথা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্যেও চীন ও ভারতকে দায়ী করার চেষ্টা চলছে। চীন ও ভারত প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট ব্যবহার করে। অথচ এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিমাণ ২০.৬ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের অর্ধেকেরও কম। চীন ও ভারতের মিলিত জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৮ গুণ বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিমাণের অর্ধেক পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট ব্যবহার করেও অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে তাদের!
কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবেই যদি বলতে হয়, তা হলে বলতে হয়, যেমনটি বলেছেন এ কে গুপ্ত, বলেছেন, Ôযদি কেউ প্রধান অপরাধীই হয়ে থাকে, তা হলে সেটি হচ্ছে বাজার।Õ তিনি বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক বাজারের প্রকৃতি,- যা পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। বাজারের মাধ্যমেই চলছে বাণিজ্যিক ফটকাবাজী, বাজারের কারণেই ঘটছে ডলারের মূল্যপতন, আবার ডলারের মূল্যপতনের কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে তেলের বাজার; পশ্চিমা জগতের কৃষিভর্তুকিতে উৎপন্ন খাদ্যসামগী্র গরিব দেশগুলোতে বাজারজাত করার মাধ্যমে বাধ্য করা হচ্ছে এসব দেশের কৃষিক্ষেত্রকে ÔউদারÕ হতে, কিন্তু এই উদারতা বরং মৃত্যু ঘটাচ্ছে স্থানীয় কৃষিবাজারের, এর দখল চলে যাচ্ছে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর হাতে। আর এইসব কারণকে একসূত্রে বেঁধেছে Ôরাজনীতি।Õ কেননা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয় অনিয়ন্ত্রিত ফাটকাবাজি হবে কি না, পণ্যবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কমবে কি না; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই বলে দেয় ঘাটতি বাড়িয়ে এবং সুদের হার কর্তন করে ডলারকে অবমূল্যায়িত করা হবে কি না এবং গরিব দেশগুলোকে তাদের কৃষিক্ষেত্রের ওপর থেকে সহায়তা কমিয়ে আনার জন্যে বাধ্য করা হবে কি না। এটিও তাই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,- খাদ্যকে একটি মৌলিক অধিকার ধরে গরিবদের সেখানে প্রবেশাধিকার দেয়ার বদলে বাজার থেকে কিনতে বাধ্য করা হবে। অর্থাৎ প্রচলিত দৃষ্টিগ্রাহ্য ও প্রচারিত জনপ্রিয় সত্যের আড়ালে রয়েছে অন্যতর আরও এক নির্মম সত্য, আর তা হলো কর্পোরেটবাদীদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থেকেই বাড়ছে বাজারে পণ্যের মূল্য। রাষ্ট্রকাঠামো, সরকার, রাজনীতিক এবং অর্থনীতিবিদরা যে এরকম অর্থনৈতিক ফাটকাবাজী চালিয়ে যাওয়াকে অনুমোদন করছেন, সেটি রীতিমতো অপরাধ। রাজ প্যাটেল তা বলেছেন, কিন্তু তিনি যদি নাও বলতেন, তবুও তা নিঃসন্দেহে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবেই দেখা হতো। সময় নিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডামাথায় চিন্তাভাবনা করে এ-পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এ-পরিকল্পনার গোপন ও শান্ত অংশীদার। এমনকি বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যে সরকার আসবে তাকেও এ-পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে। না হলে সে-সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে অথবা যারা এ-পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন বা করবেন সে-রকম কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতাতেও আসতে দেয়া হবে না। বরং যারা এ-পরিকল্পনাটিকে সমর্থন করবেন, বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবেন, তাদের মধ্যেকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীটিকেই আগামীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে আসা হবে।
বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব
বক্তৃতারত অবস্থায় অর্থনীতিবিদ জেফ্রী সাশ
তাঁর নাম জেফ্রী ডেভিড সাশ।
মার্কিন এ-ভদ্রলোক পেশাগত জীবনে অর্থনীতিবিদ। তা ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। কিন্তু এসবই তাঁর খুব শাদামাটা পরিচয়। বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সাশের গৌরবময় পরিচিতি হলো শক থেরাপী বাজারকৌশলের সফল প্রয়োগকারী হিসেবে। তাঁর পৌরহিত্যেই মধ্যনব্বইয়ে বলিভিয়ায় এবং বার্লিনপ্রাচীর ধ্বসে পড়ার পর পূর্ব জার্মানিতে শকথেরাপী বাজারকৌশল প্রয়োগ করা হয়।
১৯৮৫ সালে বলিভিয়ার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসন বলিভিয়াকে পঙ্গু করে ফেলেছিল। কিন্তু মধ্যনব্বইয়ে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের মতো বলিভিয়ায়ও দীর্ঘ ১৮ বছর পর গণতন্ত্রের হালকা হাওয়া লাগে। বলিভিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন রিগানের পরামর্শে নেয়া কিছু পদক্ষেপের কারণে অবর্ণনীয়রকম বাজে। দেশটিকে প্রতি বছর ঋণের সুদ হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ গুণতে হচ্ছিল তা ছিল জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। আর মূদ্রাস্ফীতি ছিল ১৪,০০০ শতাংশ।
এরই মধ্যে ১৯৮৫ সালে বলিভিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রাক্তন একনায়ক হুগো বানসার আর প্রাক্তন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ভিক্টর পাস এস্তেনসরো। হুগো বানসার নিশ্চিত ছিলেন, নির্বাচনে তিনি জয়ী হবেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই বানসারের পার্টি উদ্যোগ নেয় মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনার উপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের। সঙ্গতকারণেই তাদের মনে হয় এই জেফ্রী সাশ-এর কথা,- যিনি তখন হাভার্ডের অর্থনীতি বিভাগের একজন তরুণ অথচ অ্যাকাডেমিক প্রতিভার গুণে সুপরিচিত শিক্ষক – কারণ কয়েক মাস আগে বলিভিয়ার একদল রাজনীতিক হাভার্ড সফরে গেলে সাশ তাদের সামনে বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন, এই মুদ্রাস্ফীতিজনিত সংকট তিনি তাঁর পরিকল্পনার জোরে রাতারাতি ঝেড়ে ফেলতে পারেন।
এমনিতে সাশ ছিলেন অর্থনীতিবিদ কেইন্সের গুণমুগ্ধ, যার অর্থনৈতিক তত্বের সঙ্গে শিকাগোর মিল্টন ফ্রিডম্যানের তত্ত্বের বিরোধ সুবিদিত। প্রথম মহাযুদ্ধের পর উচ্চমুদ্রাস্ফীতি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের বিস্তৃতির পারস্পারিক সম্পর্কজনিত কেইন্সের লেখা থেকে সাশ অনুপ্রাণিত হন দারুণভাবে। অর্থনীতিবিদ কেইন্সের এ-উদ্ধৃতি ছিল তাঁর খুবই প্রিয় : ÔÔসমাজের বিদ্যমান ভিত্তি উল্টে দেয়ার জন্যে মুদ্রাকে বিপথগামী করার চেয়ে আর কোনও সূক্ষ্ণতর, নিশ্চিততর উপায় নেই। এ-প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক নিয়মের সকল লুকায়িত শক্তিসমূহকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।ÕÕ অর্থনীতিবিদদের পবিত্র দায়িত্ব হলো ধ্বংসাত্মক ওইসব শক্তিগুলিকে যে কোনও মূল্যে দমন করা,- তিনি ছিলেন কেইন্সের এ দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী।
কিন্তু দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কেইন্সের অর্থনীতিসংক্রান্ত বিশ্বাসের ভাগীদার হলেও তিনি ছিলেন রিগ্যানের আমেরিকাজাত সন্তান। আর রিগ্যানের আমেরিকা থেকেই উত্থান ঘটতে শুরু করে মিল্টন ফ্রিডম্যানের। এবং সাশ ছিলেন এই ফ্রিডম্যানের বাজারবিশ্বাসের, যথাযথ অর্থব্যবস্থাপনার ধারণার অনুসারী।
বলিভিয়ায় তখন প্রয়োজন ছিল পুরানো ঔপনিবেশিক মালিকানা কাঠামো ভেঙে ফেলার। ভূমিসংস্কার, বাণিজ্য সংরক্ষণ ও ভর্তুকি, প্রাকৃতিক সম্পদের জাতীয়করণ এবং সমবায়গতভাবে পরিচালিত কর্মস্থল ইত্যাদি বিবিধ উদ্ভাবনমূলক পন্থাতেই কেবল সম্ভব ছিল দেশটিকে রক্ষা করা। কিন্তু সত্যিকারের এ কাঠামোগত পরিবর্তনের ব্যাপারে সাশ-এর কোনও আগ্রহ ছিল না। কেননা তিনি নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ছাড়াও বলিভিয়ার আরেকটি মারাত্মক সমস্যা হলো সমাজতান্ত্রিক রোমান্টিকতা। তাঁর কাছে মনে হলো, তিনিও আরেক কেইন্স হতে পারবেন বলিভিয়াকে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করার মধ্যে দিয়ে। একবারও তাঁর মনে হলো না, জার্মানি থেকেও মুদ্রাস্ফীতি দূর করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু মহাবিপর্যয় ও ফ্যাসিজমের হাত থেকে জার্মানিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
তা ছাড়া কেইন্সবাদের মূল কথা হলো, মারাত্মক অর্থনৈতিক পশ্চাৎপসারণে আক্রান্ত দেশগুলিতে অর্থনীতিকে সচল করার জন্যে প্রয়োজন অর্থ ঢালা। কিন্তু সাশ নিলেন এর ঠিক বিপরীত পন্থা, তিনি বললেন, সংকটের মাঝখানে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, বিভিন্ন কিছুর মূল্য বাড়িয়ে দিতে হবে। চিলির ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই সংকোচন রেসিপি অনুসরণ করা হয়েছিল, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিপর্যয় ঘটানো হয়েছিল; আর Ôবিজনেস উইকÕ পত্রিকা ওই চিলিকে বর্ণনা করেছিল Ôড. স্ট্রেইঞ্জলভ ওয়ার্ল্ডÕ হিসেবে।
বানসারের প্রতি সাশ-এর উপদেশ ছিল খুবই খোলামেলা : কেবলমাত্র বেমওকা এক শক-থেরাপির মাধ্যমেই সম্ভব বলিভিয়াকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সংকট থেকে রক্ষা করা। এর নমুনা দিতে গিয়ে তিনি প্রস্তাব দিলেন, তেলের দাম দশগুণ বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে আরও সব পণ্যের মূল্য। তিনি বললেন, অমুক অমুক জায়গায় বাজেট কর্তন করতে হবে। বলিভিয়ান-আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আবারও জোর গলায় ভবিষ্যতবাণী করলেন, Ôএকদিনের মধ্যেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পরিসমাপ্তি ঘটবে।Õ কেননা ফ্রিডম্যানের মতো সাশ-ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বেমওকা নীতিঝাঁকুনির মধ্যে দিয়ে Ôএকটি অর্থনীতি তার শেষপ্রান্ত থেকে, সমাজতন্ত্রের প্রান্ত থেকে, ব্যাপক দুর্নীতির প্রান্ত থেকে অথবা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনার প্রান্ত থেকে একটি স্বাভাবিক বাজার অর্থনীতিতে পুনর্গঠিত হতে পারে।Õ
সাশ যখন এইসব কড়া সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সে সময়েই বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়। নির্বাচনে হুগো বানসার প্রথম হলেন, দ্বিতীয় হলেন পাস এস্তেনসরো। প্রচারণার সময় এস্তেনসরো কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন সে-সম্পর্কে খুব কমই বলেছিলেন। তা ছাড়া ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগঅবধি বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। পাস-ই ছিলেন একসময় বলিভিয়ায় চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনগুলোর উদ্যোক্তা, বড় বড় মাইনগুলি জাতীয়করণ করেন তিনি, আদিবাসী কৃষকদের কাছে জমি বন্টন করতে শুরু করেন, সকল বলিভিয়ানের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেন। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাস হয়ে পড়েন বলিভিয়ার রাজনীতির এক রহস্যপুরুষ। ১৯৮৫-এর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি আবারও তাঁর Ôজাতীয়তাবাদী বিপ্লবাত্মকÕ অতীতের প্রতি তাঁর আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং রাজস্ব কার্যক্রম সম্পর্কে বড় বড় বুলি ঝাড়তে থাকেন। যদিও তিনি সমাজতান্ত্রিক ছিলেন না, তবে অন্তত শিকাগো স্কুলের নিওলিবারাল হবেন না – অন্ততপক্ষে বলিভিয়ানদের এরকমই ধারণা ছিল।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি কে হবেন, চূড়ান্ত সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল কংগ্রেসের ওপর। আর পর্দার আড়ালে পার্টি, কংগ্রেস ও সিনেটের এই দেনদরবারে বানসার হেরে গেলেন। পাস-কে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তুলে আনার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখলেন একজন নির্বাচিত সিনেটর গনসালো সানচেস দে লোসাদা, যিনি বলিভিয়ায় সাধারণভাবে পরিচিত গনি নামে। এত দীর্ঘদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন যে তিনি স্প্যানিশ বলতেন মার্কিনী উচ্চারণে। বলিভিয়ায় তিনি ফিরে এসেছিলেন দেশটির সবচেয়ে সম্পদবান ব্যবসায়ী হবার লক্ষ্য নিয়ে। ওই সময়েই তিনি ছিলেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যক্তিমালিকানাধীন খনির মালিক, যা পরে পরিণত হয় দেশের বৃহত্তম খনিতে। গনি লেখাপড়া করতেন ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে। অর্থনীতির ছাত্র না হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন ফ্রিডম্যানের বাজারমন্ত্রে। তখনও বলিভিয়ার খনিসম্পদ ছিল মুখ্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। তাই সাশ যখন বানসারের টিমের কাছে তাঁর শক-থেরাপী তুলে ধরেন, গনি তাতে প্রভাবিত হন ভীষণরকম। বলিভিয়ায় নিযুক্ত ওই সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূতও ভূমিকা রাখেন এ-ব্যাপারে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর তিনি বলেন, কেবলমাত্র শকরুট ধরে এগিয়ে গেলেই বলিভিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য অব্যাহত থাকবে।
পর্দার আড়ালের বিভিন্ন সমীকরণ থেকে আগস্ট ০৬, ১৯৮৫তে পাস-এর হাতে বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব তুলে দেয়া হলো কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। আর এর মাত্র চারদিন পর বলিভিয়ার অর্থনীতিকে ঝড়ের গতিতে আমুল পরিবর্তন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ-গোপনীয় দ্বি-পক্ষীয় অর্থনৈতিক টিমের নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে পাস-এর পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হলো গনসালো সানচেস দে লোসাদা ওরফে গনিকে। আর এই টিম বেছে নিলো সাশ প্রস্তাবিত শক-থেরাপীকে। কয়েক দশক আগে পাস-এর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের যে-রূপ নির্মিত হয়েছিল, সেটি বাতিল করার পরিকল্পনা নেয়া হলো। এমনকি পাস-এর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও অন্ধকারে ছিলেন অর্থনৈতিক এই টিম ও পরিকল্পনার ব্যাপারে। বলিভিয়ার সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন আর কৃষক সংগঠনগুলি যাতে এ ব্যাপারে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে না পারে, সে-জন্যে বজায় রাখা হলো কঠোর গোপনীয়তা। ১৭ দিন পর পাস-এর পরিকল্পনামন্ত্রী গিলের্মো বেদ্রেগাল বলিভিয়ার শক-থেরাপী কর্মসূচির ড্রাফটটি তাঁর হাতে পেলেন। এতে বলা হলো খাদ্য ভর্তুকি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রায় সবটাই বাতিল করা হবে এবং তেলের মূল্য ৩০০ শতাংশ বাড়ানো হবে। বলা হলো এর ফলে অবস্থার যত অবনতিই ঘটুক, এমনকি সরকারি বেতনও বাড়ানো হবে না। বলা হলো, সরকারি ব্যয় একেবারেই কমিয়ে ফেলা হবে, বলিভিয়ার সীমান্তে কোনও আমদানিপ্রতিবন্ধকতা থাকবে না এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানীগুলো সংকুচিত করা হবে অথবা বেসরকারিকরণ করা হবে। সত্তর দশকের ব্যর্থ নিওলিবারাল বিপ্লব নতুন করে শুরু হলো বলিভিয়াতে।
যারা এ-পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা নিজেরাই শংকিত ছিলেন বলিভিয়ার জনগণের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। অর্থনৈতিক টিমটি যখন বলিভিয়ার আইএমএফ কর্মকর্তাদের হাতে এই পরিকল্পনার খসড়া তুলে ধরেন তখন আইএমএফ প্রতিনিধি যা বলেছিলেন তা ছিল একইসঙ্গে উৎসাহব্যঞ্জক ও ভীতিকর। তিনি বলেছিলেন, Ôআইএমএফ-এর প্রতিটি কর্মকর্তা যেরকম স্বপ্ন দেখে, এটি হলো সেরকমই এক পরিকল্পনা। কিন্তু যদি এটি কাজ না করে, তা হলে সৌভাগ্যজনক ব্যাপার হলো আমার জন্যে আছে কূটনৈতিক আশীর্বাদ। বিমানে চড়ে পালিয়ে চলে যেতে পারব আমি।Õ
এ-পরিকল্পনা নিজেদের কাছেই এত ভয়াবহ মনে হয়েছিল যে ওই টিমের সবচেয়ে তরুণ সদস্য ফারনান্দো প্রাদো বলেছিলেন, Ôতারা (জনগণ) আমাদের মেরে ফেলবে।Õ আর পরিকল্পনার মূল লেখক ও বলিভিয়ার পরিকল্পনামন্ত্রী বেদ্রেগাল তখন বলেছিলেন, Ôআমাদের হতে হবে হিরোশিমার পাইলটের মতো। যখন সে পারমাণবিক বোমা ফেলছিল তখনও সে জানতো না কী সে করতে চলেছে। কিন্তু ধোঁয়া উড়তে দেখে সে বলেছিল, ওওপস…স্যরি! এবং ঠিক এমনটাই আমাদের করতে হবে, পরিকল্পনাটা শুরু করতে হবে এবং তারপর বলতে হবে: এহ্…স্যরি!Õ
এইভাবে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলো। মাত্র পাঁচটি অনুলিপি করা হলো পরিকল্পনার। একটি কপি রাষ্ট্রপতি পাস-এর জন্যে, একটি কপি তাঁর উপদেষ্টা গনির জন্যে, একটি কপি ট্রেজারি মন্ত্রীর জন্যে। বাদবাকি দুটি কপি কাদের জন্যে করা হয়েছিল তা জানতে পারলেই আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে, কথিত গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পাস সেদিন তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে আসলে নির্ভর করছিলেন কাদের ওপর। বাকি দুটো কপি তৈরি করা হয়েছিল, একটি সেনাবাহিনীর প্রধানের জন্যে আর আরেকটি পুলিশপ্রধানের জন্যে!
তিন সপ্তাহ পর বলিভিয়ার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক বসল। সেখানে ৬০ পৃষ্ঠার পরিকল্পনাটি পড়ে শোনানো হলো। এসময় পাস তাঁর মন্ত্রিদের উদ্দেশ্যে বললেন, এটি তাদের পড়ে শোনানো হচ্ছে শুধুমাত্র জানানোর জন্যে, বিতর্কের জন্যে নয়। তাদের এ পরিকল্পনার ব্যাপারে কোনও আপত্তি থাকলে তারা পদত্যাগ করতে পারেন। প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখালেন শিল্পমন্ত্রী। বললেন, আমি একমত নই।
তা হলে আপনি আসুন।- পাস বললেন তাঁকে। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী উঠলেন না, গেলেন না। এবং তারপর সবাই চুপ হয়ে গেলো। কেউ আর কিছুই বললেন না, পদত্যাগও করল না। কিছুদিন পর সাশ বলিভিয়ায় এসে পাস-এর উপদেষ্টা হিসেবে মোটামুটি স্থায়ীভাবে খুঁটি গেঁড়ে বসলেন। পণ্যমূল্যবৃদ্ধির ঘোরতর সমর্থক হলেও বেতনবৃদ্ধির ঘোরতর বিরোধী হিসেবে তিনি সক্রিয়তা দেখাতে লাগলেন।
দুই বছরের মধ্যে বলিভিয়ার মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশে নেমে এলো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পরিস্থিতির উন্নতি হলো। প্রকৃত মজুরি বরং আরও ৪০ শতাংশ কমে গেল। ১৯৮৫ সালে শক-থেরাপী শুরু হওয়ার বছরে বলিভিয়ার মানুষের মাথা পিছু আয় ছিল ৮৪৫ ডলারে। আর দু বছর পরে তা নেমে দাঁড়ালো ৭৮৯ ডলারে। ১৯৮৭ সালে বলিভিয়ার একজন কৃষকের গড় বার্ষিক আয় নেমে এলো বছরে মাত্র ১৪০ ডলারে, যা সেখানকার মাথাপিছু গড় আয়ের মাত্র এক-পঞ্চমাংশেরও কম!
কিন্তু এসবে কোনও কিছুই এলো-গেলো না। কেননা বলিভিয়ার সাধারণ মানুষ অনাহারে মারা যাক, কাজ না পেয়ে ভিক্ষা করুক, বাড়িঘর বিক্রি করে তাবুতে বাস করুক, তাদের মেয়েরা বেশ্যা হয়ে যাক,- তাতে কিইবা আসে যায়? মুদ্রাস্ফীতি তো কমেছে! সাশ-এর ওপর অর্পিত দায়িত্ব তো এটিই ছিল! সাপের কামড়ে মানুষ মারা গেছে, তাতে কি হয়েছে? চোখ তো বেঁচে গেছে!
দুই.
জেফ্রী সাশ আর বলিভিয়ার এই সত্যিকারের কাহিনী কেন আবারও মনে করলাম?
কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে এই জেফ্রী সাশ আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। গত ০৫ মে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের সামনে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট সমাধানের রূপরেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, Ôযদি আমরা শুধুমাত্র জরুরী খাদ্যসাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি তা হলে এ সমস্যার সমাধান করতে পারব না।Õ কী করতে হবে তা হলে? না, জরুরি সাহায্য দেয়া চলবে না। তার বদলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির গরিব কৃষকদের কাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে। এবং এভাবেই সমস্যা সমাধানের একটি দীর্ঘমেয়াদী পথ তৈরি হবে। তিনি তাই বলেছেন, Ôব্যয়বহুল খাদ্যসামগ্রী জাহাজীকরণ করার বদলে আমাদের বরং উচিত গরিবদের মধ্যেকার গরিবতরদের আরও বেশি বেশি খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করা।Õ
জেফ্রী সাশ আর বলিভিয়ার এই সত্যিকারের ঘটনা মনে করার আরও একটি কারণ : আর মাত্র দুÕএক বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীর পাহারায় বাংলাদেশের প্রচল রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা আমাদের প্রিয় দেশটিতে বলিভিয়ার মতোই ভয়ঙ্কর সব পরিণতি ডেকে আনার পরিকল্পনা ফেঁদেছেন। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক অবধি মার্কিন অর্থনীতিবিদরা ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে যে শক-থেরাপী পদ্ধতির প্রয়োগ করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন, একবিংশ শতাব্দীতে সেই ব্যর্থ মডেলটি বাংলাদেশে প্রয়োগ করে মূলত ঠাণ্ডা মাথায় লাখ লাখ মানুষকে অনাহারে ও বিনা কাজে মারার হিংস্র খেলায় মেতে উঠেছেন তাঁরা। (আগামীপর্বে সমাপ্য)।
-
সাম্প্রতিক
- আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ
- বিদায় স্বায়ত্তশাসন ও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা?
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, তৃতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব
- শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার : সামান্য মুখবন্ধ
- বিধবা সময়ের গল্প
-
লিঙ্ক
-
আর্কাইভ
-
ক্যাটাগরি
-
RSS
Entries RSS
Comments RSS