walking in hibernation

Just another WordPress.com weblog

বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব

বক্তৃতারত অবস্থায় অর্থনীতিবিদ জেফ্রী সাশ

তাঁর নাম জেফ্রী ডেভিড সাশ।

মার্কিন এ-ভদ্রলোক পেশাগত জীবনে অর্থনীতিবিদতা ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের উপদেষ্টাও ছিলেন তিনিকিন্তু এসবই তাঁর খুব শাদামাটা পরিচয়বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সাশের গৌরবময় পরিচিতি হলো শক থেরাপী বাজারকৌশলের সফল প্রয়োগকারী হিসেবেতাঁর পৌরহিত্যেই মধ্যনব্বইয়ে বলিভিয়ায় এবং বার্লিনপ্রাচীর ধ্বসে পড়ার পর পূর্ব জার্মানিতে শকথেরাপী বাজারকৌশল প্রয়োগ করা হয়

১৯৮৫ সালে বলিভিয়ার অবস্থা ছিল ভয়াবহদীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসন বলিভিয়াকে পঙ্গু করে ফেলেছিলকিন্তু মধ্যনব্বইয়ে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের মতো বলিভিয়ায়ও দীর্ঘ ১৮ বছর পর গণতন্ত্রের হালকা হাওয়া লাগেবলিভিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন রিগানের পরামর্শে নেয়া কিছু পদক্ষেপের কারণে অবর্ণনীয়রকম বাজেদেশটিকে প্রতি বছর ঋণের সুদ হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ গুণতে হচ্ছিল তা ছিল জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশিআর মূদ্রাস্ফীতি ছিল ১৪,০০০ শতাংশ

এরই মধ্যে ১৯৮৫ সালে বলিভিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়এ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রাক্তন একনায়ক হুগো বানসার আর প্রাক্তন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ভিক্টর পাস এস্তেনসরো। হুগো বানসার নিশ্চিত ছিলেন, নির্বাচনে তিনি জয়ী হবেননির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই বানসারের পার্টি উদ্যোগ নেয় মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনার উপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নেরসঙ্গতকারণেই তাদের মনে হয় এই জেফ্রী সা-এর কথা,- যিনি তখন হাভার্ডের অর্থনীতি বিভাগের একজন তরুণ অথচ অ্যাকাডেমিক প্রতিভার গুণে সুপরিচিত শিক্ষক - কারণ কয়েক মাস আগে বলিভিয়ার একদল রাজনীতিক হাভার্ড সফরে গেলে সাশ তাদের সামনে বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন, এই মুদ্রাস্ফীতিজনিত সংকট তিনি তাঁর পরিকল্পনার জোরে রাতারাতি ঝেড়ে ফেলতে পারেন

এমনিতে সা ছিলেন অর্থনীতিবিদ কেইন্সের গুণমুগ্ধ, যার অর্থনৈতিক তত্বের সঙ্গে শিকাগোর মিল্টন ফ্রিডম্যানের তত্ত্বের বিরোধ সুবিদিতপ্রথম মহাযুদ্ধের পর উচ্চমুদ্রাস্ফীতি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের বিস্তৃতির পারস্পারিক সম্পর্কজনিত কেইন্সের লেখা থেকে সাঅনুপ্রাণিত হন দারুণভাবেঅর্থনীতিবিদ কেইন্সের -উদ্ধৃতি ছিল তাঁর খুবই প্রিয় : ÔÔসমাজের বিদ্যমান ভিত্তি উল্টে দেয়ার জন্যে মুদ্রাকে বিপথগামী করার চেয়ে আর কোনও সূক্ষ্ণতর, নিশ্চিততর উপায় নেই-প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক নিয়মের সকল লুকায়িত শক্তিসমূহকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ÕÕ অর্থনীতিবিদদের পবিত্র দায়িত্ব হলো ধ্বংসাত্মক ওইসব শক্তিগুলিকে যে কোনও মূল্যে দমন করা,- তিনি ছিলেন কেইন্সের এ দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী

কিন্তু দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কেইন্সের অর্থনীতিসংক্রান্ত বিশ্বাসের ভাগীদার হলেও তিনি ছিলেন রিগ্যানের আমেরিকাজাত সন্তানআর রিগ্যানের আমেরিকা থেকেই উত্থান ঘটতে শুরু করে মিল্টন ফ্রিডম্যানেরএবং সা ছিলেন এই ফ্রিডম্যানের বাজারবিশ্বাসের, যথাযথ অর্থব্যবস্থাপনার ধারণার অনুসারী

বলিভিয়ায় তখন প্রয়োজন ছিল পুরানো ঔপনিবেশিক মালিকানা কাঠামো ভেঙে ফেলারভূমিসংস্কার, বাণিজ্য সংরক্ষণ ও ভর্তুকি, প্রাকৃতিক সম্পদের জাতীয়করণ এবং সমবায়গতভাবে পরিচালিত কর্মস্থল ইত্যাদি বিবিধ উদ্ভাবনমূলক পন্থাতেই কেবল সম্ভব ছিল দেশটিকে রক্ষা করাকিন্তু সত্যিকারের এ কাঠামোগত পরিবর্তনের ব্যাপারে সাশ-এর কোনও আগ্রহ ছিল নাকেননা তিনি নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ছাড়াও বলিভিয়ার আরেকটি মারাত্মক সমস্যা হলো সমাজতান্ত্রিক রোমান্টিকতাতাঁর কাছে মনে হলো, তিনিও আরেক কেইন্স হতে পারবেন বলিভিয়াকে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করার মধ্যে দিয়েএকবারও তাঁর মনে হলো না, জার্মানি থেকেও মুদ্রাস্ফীতি দূর করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু মহাবিপর্যয় ও ফ্যাসিজমের হাত থেকে জার্মানিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি

তা ছাড়া কেইন্সবাদের মূল কথা হলো, মারাত্মক অর্থনৈতিক পশ্চাপসারণে আক্রান্ত দেশগুলিতে অর্থনীতিকে সচল করার জন্যে প্রয়োজন অর্থ ঢালাকিন্তু সানিলেন এর ঠিক বিপরীত পন্থা, তিনি বললেন, সংকটের মাঝখানে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, বিভিন্ন কিছুর মূল্য বাড়িয়ে দিতে হবেচিলির ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই সংকোচন রেসিপি অনুসরণ করা হয়েছিল, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিপর্যয় ঘটানো হয়েছিল; আর Ôবিজনেস উইকÕ পত্রিকা ওই চিলিকে বর্ণনা করেছিল Ôড. স্ট্রেইঞ্জলভ ওয়ার্ল্ডÕ হিসেবে

বানসারের প্রতি সাশ-এর উপদেশ ছিল খুবই খোলামেলা : কেবলমাত্র বেমওকা এক শক-থেরাপির মাধ্যমেই সম্ভব বলিভিয়াকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সংকট থেকে রক্ষা করাএর নমুনা দিতে গিয়ে তিনি প্রস্তাব দিলেন, তেলের দাম দশগুণ বাড়াতে হবেবাড়াতে হবে আরও সব পণ্যের মূল্যতিনি বললেন, অমুক অমুক জায়গায় বাজেট কর্তন করতে হবেবলিভিয়ান-আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আবারও জোর গলায় ভবিষ্যতবাণী করলেন, Ôএকদিনের মধ্যেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পরিসমাপ্তি ঘটবেÕ কেননা ফ্রিডম্যানের মতো সাশ-ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বেমওকা নীতিঝাঁকুনির মধ্যে দিয়ে Ôএকটি অর্থনীতি তার শেষপ্রান্ত থেকে, সমাজতন্ত্রের প্রান্ত থেকে, ব্যাপক দুর্নীতির প্রান্ত থেকে অথবা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনার  প্রান্ত থেকে একটি স্বাভাবিক বাজার অর্থনীতিতে পুনর্গঠিত হতে পারেÕ

সাযখন এইসব কড়া সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সে সময়েই বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়নির্বাচনে হুগো বানসার প্রথম হলেন, দ্বিতীয় হলেন পাস এস্তেনসরো। প্রচারণার সময় এস্তেনসরো কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন সে-সম্পর্কে খুব কমই বলেছিলেনতা ছাড়া ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগঅবধি বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনিপা-ই ছিলেন একসময় বলিভিয়ায় চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনগুলোর উদ্যোক্তা,  বড় বড় মাইনগুলি জাতীয়করণ করেন তিনি, আদিবাসী কৃষকদের কাছে জমি বন্টন করতে শুরু করেন, সকল বলিভিয়ানের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেনকিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাস হয়ে পড়েন বলিভিয়ার রাজনীতির এক রহস্যপুরুষ১৯৮৫-এর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি আবারও তাঁর Ôজাতীয়তাবাদী বিপ্লবাত্মকÕ অতীতের প্রতি তাঁর আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং রাজস্ব কার্যক্রম সম্পর্কে বড় বড় বুলি ঝাড়তে থাকেনযদিও তিনি সমাজতান্ত্রিক ছিলেন না, তবে অন্তত শিকাগো স্কুলের নিওলিবারাল হবেন না - অন্ততপক্ষে বলিভিয়ানদের এরকমই ধারণা ছিল

কিন্তু রাষ্ট্রপতি কে হবেন, চূড়ান্ত সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল কংগ্রেসের ওপরআর পর্দার আড়ালে পার্টি, কংগ্রেস ও সিনেটের এই দেনদরবারে বানসার হেরে গেলেনপাস-কে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তুলে আনার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখলেন একজন নির্বাচিত সিনেটর গনসালো সানচেস দে লোসাদা, যিনি বলিভিয়ায় সাধারণভাবে পরিচিত গনি নামেএত দীর্ঘদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন যে তিনি স্প্যানিশ বলতেন মার্কিনী উচ্চারণেবলিভিয়ায় তিনি ফিরে এসেছিলেন দেশটির সবচেয়ে সম্পদবান ব্যবসায়ী হবার লক্ষ্য নিয়েওই সময়েই তিনি ছিলেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যক্তিমালিকানাধীন খনির মালিক, যা পরে পরিণত হয় দেশের বৃহত্তম খনিতেগনি লেখাপড়া করতেন ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতেঅর্থনীতির ছাত্র না হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন ফ্রিডম্যানের বাজারমন্ত্রেতখনও বলিভিয়ার খনিসম্পদ ছিল মুখ্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেতাই সাযখন বানসারের টিমের কাছে তাঁর শক-থেরাপী তুলে ধরেন, গনি তাতে প্রভাবিত হন ভীষণরকমবলিভিয়ায় নিযুক্ত ওই সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূতও ভূমিকা রাখেন এ-ব্যাপারেরাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর তিনি বলেন, কেবলমাত্র শকরুট ধরে এগিয়ে গেলেই বলিভিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য অব্যাহত থাকবে

পর্দার আড়ালের বিভিন্ন সমীকরণ থেকে আগস্ট ০৬, ১৯৮৫তে পাস-এর হাতে বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব তুলে দেয়া হলো কংগ্রেসের পক্ষ থেকেআর এর মাত্র চারদিন পর বলিভিয়ার অর্থনীতিকে ঝড়ের গতিতে আমুল পরিবর্তন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ-গোপনীয় দ্বি-পক্ষীয় অর্থনৈতিক টিমের নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে পাস-এর পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হলো গনসালো সানচেস দে লোসাদা ওরফে গনিকেআর এই টিম বেছে নিলো সাপ্রস্তাবিত শক-থেরাপীকেকয়েক দশক আগে পাস-এর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের যে-রূপ নির্মিত হয়েছিল, সেটি বাতিল করার পরিকল্পনা নেয়া হলোএমনকি পাস-এর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও অন্ধকারে ছিলেন অর্থনৈতিক এই টিম ও পরিকল্পনার ব্যাপারেবলিভিয়ার সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন আর কৃষক সংগঠনগুলি যাতে এ ব্যাপারে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে না পারে, সে-জন্যে বজায় রাখা হলো কঠোর গোপনীয়তা১৭ দিন পর পাস-এর পরিকল্পনামন্ত্রী গিলের্মো বেদ্রেগাল বলিভিয়ার শক-থেরাপী কর্মসূচির ড্রাফটটি তাঁর হাতে পেলেনএতে বলা হলো খাদ্য ভর্তুকি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রায় সবটাই বাতিল করা হবে এবং তেলের মূল্য ৩০০ শতাংশ বাড়ানো হবেবলা হলো এর ফলে অবস্থার যত অবনতিই ঘটুক, এমনকি সরকারি বেতনও বাড়ানো হবে নাবলা হলো, সরকারি ব্যয় একেবারেই কমিয়ে ফেলা হবে, বলিভিয়ার সীমান্তে কোনও আমদানিপ্রতিবন্ধকতা থাকবে না এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানীগুলো সংকুচিত করা হবে অথবা বেসরকারিকরণ করা হবেসত্তর দশকের ব্যর্থ নিওলিবারাল বিপ্লব নতুন করে শুরু হলো বলিভিয়াতে

যারা এ-পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা নিজেরাই শংকিত ছিলেন বলিভিয়ার জনগণের প্রতিক্রিয়া নিয়েঅর্থনৈতিক টিমটি যখন বলিভিয়ার আইএমএফ কর্মকর্তাদের হাতে এই পরিকল্পনার খসড়া তুলে ধরেন তখন আইএমএফ প্রতিনিধি যা বলেছিলেন তা ছিল একইসঙ্গে উসাহব্যঞ্জক ও ভীতিকরতিনি বলেছিলেন, Ôআইএমএফ-এর প্রতিটি কর্মকর্তা যেরকম স্বপ্ন দেখে, এটি হলো সেরকমই এক পরিকল্পনাকিন্তু যদি এটি কাজ না করে, তা হলে সৌভাগ্যজনক ব্যাপার হলো আমার জন্যে আছে কূটনৈতিক আশীর্বাদবিমানে চড়ে পালিয়ে চলে যেতে পারব আমিÕ

-পরিকল্পনা নিজেদের কাছেই এত ভয়াবহ মনে হয়েছিল যে ওই টিমের সবচেয়ে তরুণ সদস্য ফারনান্দো প্রাদো বলেছিলেন, Ôতারা (জনগণ) আমাদের মেরে ফেলবেÕ আর পরিকল্পনার মূল লেখক ও বলিভিয়ার পরিকল্পনামন্ত্রী বেদ্রেগাল তখন বলেছিলেন, Ôআমাদের হতে হবে হিরোশিমার পাইলটের মতোযখন সে পারমাণবিক বোমা ফেলছিল তখন সে জানতো না কী সে করতে চলেছে কিন্তু ধোঁয়া উড়তে দেখে সে বলেছিল, ওওপস…স্যরি! এবং ঠিক এমনটাই আমাদের করতে হবে, পরিকল্পনাটা শুরু করতে হবে এবং তারপর বলতে হবে: এহ্‌…স্যরি!Õ

এইভাবে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলোমাত্র পাঁচটি অনুলিপি করা হলো পরিকল্পনারএকটি কপি রাষ্ট্রপতি পাস-এর জন্যে, একটি কপি তাঁর উপদেষ্টা গনির জন্যে, একটি কপি ট্রেজারি মন্ত্রীর জন্যেবাদবাকি দুটি কপি কাদের জন্যে করা হয়েছিল তা জানতে পারলেই আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে, কথিত গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পা সেদিন তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে আসলে নির্ভর করছিলেন কাদের ওপরবাকি দুটো কপি তৈরি করা হয়েছিল, একটি সেনাবাহিনীর প্রধানের জন্যে আর আরেকটি পুলিশপ্রধানের জন্যে!

তিন সপ্তাহ পর বলিভিয়ার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক বসলসেখানে ৬০ পৃষ্ঠার পরিকল্পনাটি পড়ে শোনানো হলোএসময় পা তাঁর মন্ত্রিদের উদ্দেশ্যে বললেন, এটি তাদের পড়ে শোনানো হচ্ছে শুধুমাত্র জানানোর জন্যে, বিতর্কের জন্যে নয়তাদের এ পরিকল্পনার ব্যাপারে কোনও আপত্তি থাকলে তারা পদত্যাগ করতে পারেনপ্রথম প্রতিক্রিয়া দেখালেন শিল্পমন্ত্রীবললেন, আমি একমত নই

তা হলে আপনি আসুন।- পাস বললেন তাঁকেকিন্তু শিল্পমন্ত্রী উঠলেন না, গেলেন নাএবং তারপর সবাই চুপ হয়ে গেলোকেউ আর কিছুই বললেন না, পদত্যাগও করল নাকিছুদিন পর সাশ বলিভিয়ায় এসে পাস-এর উপদেষ্টা হিসেবে মোটামুটি স্থায়ীভাবে খুঁটি গেঁড়ে বসলেনপণ্যমূল্যবৃদ্ধির ঘোরতর সমর্থক হলেও বেতনবৃদ্ধির ঘোরতর বিরোধী হিসেবে তিনি সক্রিয়তা দেখাতে লাগলেন

দুই বছরের মধ্যে বলিভিয়ার মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশে নেমে এলোকিন্তু তার মানে এই নয় যে পরিস্থিতির উন্নতি হলোপ্রকৃত মজুরি বরং আরও ৪০ শতাংশ কমে গেল১৯৮৫ সালে শক-থেরাপী শুরু হওয়ার বছরে বলিভিয়ার মানুষের মাথা পিছু আয় ছিল ৮৪৫ ডলারেআর দু বছর পরে তা নেমে দাঁড়ালো ৭৮৯ ডলারে১৯৮৭ সালে বলিভিয়ার একজন কৃষকের গড় বার্ষিক আয় নেমে এলো বছরে মাত্র ১৪০ ডলারে, যা সেখানকার মাথাপিছু গড় আয়ের মাত্র এক-পঞ্চমাংশেরও কম!

কিন্তু এসবে কোনও কিছুই এলো-গেলো নাকেননা বলিভিয়ার সাধারণ মানুষ অনাহারে মারা যাক, কাজ না পেয়ে ভিক্ষা করুক, বাড়িঘর বিক্রি করে তাবুতে বাস করুক, তাদের মেয়েরা বেশ্যা হয়ে যাক,- তাতে কিইবা আসে যায়? মুদ্রাস্ফীতি তো কমেছে! সাশ-এর ওপর অর্পিত দায়িত্ব তো এটিই ছিল! সাপের কামড়ে মানুষ মারা গেছে, তাতে কি হয়েছে? চোখ তো বেঁচে গেছে!

 

দুই.

জেফ্রী সাশ আর বলিভিয়ার এই সত্যিকারের কাহিনী কেন আবারও মনে করলাম?

কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে এই জেফ্রী সা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেনগত ০৫ মে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের সামনে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট সমাধানের রূপরেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, Ôযদি আমরা শুধুমাত্র জরুরী খাদ্যসাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি তা হলে এ সমস্যার সমাধান করতে পারব নাÕ কী করতে হবে তা হলে? না, জরুরি সাহায্য দেয়া চলবে নাতার বদলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির গরিব কৃষকদের কাঠামোগত সহায়তা দিতে হবেএবং এভাবেই সমস্যা সমাধানের একটি দীর্ঘমেয়াদী পথ তৈরি হবেতিনি তাই বলেছেন, Ôব্যয়বহুল খাদ্যসামগ্রী জাহাজীকরণ করার বদলে আমাদের বরং উচিত গরিবদের মধ্যেকার গরিবতরদের আরও বেশি বেশি খাদ্য উপাদনে সহায়তা করাÕ

জেফ্র সাআর বলিভিয়ার এই সত্যিকারের ঘটনা মনে করার আরও একটি কারণ : আর মাত্র দুÕএক বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীর পাহারায় বাংলাদেশের প্রচল রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা আমাদের প্রিয় দেশটিতে বলিভিয়ার মতোই ভয়ঙ্কর সব পরিণতি ডেকে আনার পরিকল্পনা ফেঁদেছেনসত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক অবধি মার্কিন অর্থনীতিবিদরা ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে যে শক-থেরাপী পদ্ধতির প্রয়োগ করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন, একবিংশ শতাব্দীতে সেই ব্যর্থ মডেলটি বাংলাদেশে প্রয়োগ করে মূলত ঠাণ্ডা মাথায় লাখ লাখ মানুষকে অনাহারে ও বিনা কাজে মারার হিংস্র খেলায় মেতে উঠেছেন তাঁরা। (আগামীপর্বে সমাপ্য)।

 

জুন 4, 2008 - Posted by imtiarshamim | দিনগুলি রাতগুলি | , , , , , , | কোন মন্তব্য নেই

কোন মন্তব্য নেই »

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য দিন