বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
তিন.
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর দুর্নীতিতে আক্রান্ত রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার নামে প্রকাশ্যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়, নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়; কিন্তু সংগোপনে শুরু হয় বাজার পুনর্গঠনের কাজ। আর তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। হু হু করে জিনিসপত্রের মূল্য বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের কর্পোরেটপন্থী মিডিয়াগুলো এখনও ছবক দিয়ে চলেছে, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ার পেছনে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনও হাত নেই। কারণ, এসব মিডিয়াগুলোর প্রচারণার ভাষায় বলতে গেলে, Ôআন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোতে জ্বৈবজ্বালানি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রসারিত হয়েছে চীন ও ভারতের মতো জনবহুল দেশের খাদ্যবাজার। খাদ্যমূল্য বাড়ছে এসব কারণে।Õ শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে তারা আরও একটি সত্য জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে : Ôআগামী এক বছরের মধ্যে খাদ্যমূল্য কমার কোনও সম্ভাবনাই নেই এবং সস্তা খাবারের যুগ শেষ।Õ
আপাতদৃষ্টিতে এসব সত্যই বটে। সত্য শস্য-তালিকা ক্রমাগত কমে আসছে, এশিয়ায় পশুজাত সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে পৃথিবী জুড়ে জনসংখ্যা, বৈশ্বিক তাপমাত্রা, জৈবজ্বালানির চাহিদা, দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্যিক ফটকাবাজী, কমছে ডলারের দাম, প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে অশোধিত তেলের বাজারমূল্য, বিরূপ ভূমিকা রাখছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর নীতিসমূহ, আমদানি প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি সব কিছু। এসবের প্রতিটিই কোনও না কোনওভাবে পণ্যমূল্য বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
তারপরও দেখা যাচ্ছে, এ-সব সত্যের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। যেমন, জনবহুলতার হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম বড় বাজার ভারত ও চীনে। কর্পোরেট গবেষকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ দুটি দেশের মানুষদের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষত মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্যের মাধ্যমে। অথচ মানুষের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়াটা কোনও নতুন প্রবণতা নয়, দশকের পর দশক ধরে দেশকাল নির্বিশেষে এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এটি পুরোপুরি অস্বাভাবিক যে, ২০ থেকে ৩০ বছরের একটি স্থিতিশীল ও ধারাবাহিক বৃদ্ধিহারের বিপরীতে দু’এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাবে। উদাহরণত, ভারতে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৩-এর মধ্যে ব্যক্তিপ্রতি ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ১৫৩ ক্যালরি, তার মানে বছরপ্রতি ১২ ক্যালরির মতো; চীনে সেখানে মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ২৩১ ক্যালরি, অর্থাৎ বছরপ্রতি ১৮ ক্যালরি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১০ ক্যালরি। অর্থাৎ ক্যালরি গ্রহণের তারতম্য দিয়েই যদি পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণ দাঁড় করানো হয়, সে-ক্ষেত্রে দায়ী করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকেই। আবার শস্য-তালিকা ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে এলেও গেল বছর ফসল উৎপাদন অনেক বেড়েছে। আমাদের শোনানো হচ্ছে খাদ্য আর এনার্জি, এ-দুয়ের উত্তরোত্তর চাহিদা বাড়ার কথা আর সরবরাহে অনিয়মের কথা; কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় খরা হলেও, চীনে বরফপাত ও তুষারঝড় বয়ে গেলেও এবং মার্কিনী ব্রেডবাস্কেটে ঠাণ্ডা ও আর্দ্র শীত নেমে এলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। ইউএন খাদ্য ও কৃষি সংগঠন আমাদের তথ্য দিচ্ছে যে, বার্ষিক বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন ৯২ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে গিয়ে ২০০৭-২০০৮ সালে ২.১০২ বিলিয়ন টনে ঠেকেছে। তবে এই বৃদ্ধির প্রায় সবটাই ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে। আর যুক্তরাষ্ট্র সে-শস্য জৈবজ্বালানি শিল্পে যোগান দেয়ার তথ্য দেখাচ্ছে। তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু উদ্ঘাটন করা সত্যিই কঠিন যে সুপরিকল্পিত ফাটকাবাজী কীভাবে ঘটেছে। রাজ প্যাটেলের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর পশুদের খাওয়ানো হয়েছে ৭৪০ মিলিয়ন টন খাদ্য, যা দিয়ে বর্তমান সময়ের খাদ্যঘাটতিকে কমপক্ষে ১৪ বার ঠেকানো যেত। মূল্য বেড়ে যাওয়ার জন্যে জৈবজ্বালানি শিল্পবাদীরা আবার আগ্রহী চীনকে দোষারোপ করতে। গত এপ্রিল ২০০৮-এ তাদের পত্রিকা বায়োফুয়েল ডাইজেস্টস-এ একটি সমীক্ষা ছাপা হয়েছে এই শিরোনামে : Ôবৈশ্বিক শস্যঘাটতির কারণ চীনের মাংসব্যবহার।Õ অথচ ওই সমীক্ষাতেই দেখানো হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০০৭ এর মধ্যে চীনের মাথাপিছু মাংসচাহিদা বেড়েছে মাত্র সাত পাউন্ডেরও কম। একইভাবে এনার্জি চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে তথা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্যেও চীন ও ভারতকে দায়ী করার চেষ্টা চলছে। চীন ও ভারত প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট ব্যবহার করে। অথচ এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিমাণ ২০.৬ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের অর্ধেকেরও কম। চীন ও ভারতের মিলিত জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৮ গুণ বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিমাণের অর্ধেক পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট ব্যবহার করেও অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে তাদের!
কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবেই যদি বলতে হয়, তা হলে বলতে হয়, যেমনটি বলেছেন এ কে গুপ্ত, বলেছেন, Ôযদি কেউ প্রধান অপরাধীই হয়ে থাকে, তা হলে সেটি হচ্ছে বাজার।Õ তিনি বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক বাজারের প্রকৃতি,- যা পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। বাজারের মাধ্যমেই চলছে বাণিজ্যিক ফটকাবাজী, বাজারের কারণেই ঘটছে ডলারের মূল্যপতন, আবার ডলারের মূল্যপতনের কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে তেলের বাজার; পশ্চিমা জগতের কৃষিভর্তুকিতে উৎপন্ন খাদ্যসামগী্র গরিব দেশগুলোতে বাজারজাত করার মাধ্যমে বাধ্য করা হচ্ছে এসব দেশের কৃষিক্ষেত্রকে ÔউদারÕ হতে, কিন্তু এই উদারতা বরং মৃত্যু ঘটাচ্ছে স্থানীয় কৃষিবাজারের, এর দখল চলে যাচ্ছে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর হাতে। আর এইসব কারণকে একসূত্রে বেঁধেছে Ôরাজনীতি।Õ কেননা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয় অনিয়ন্ত্রিত ফাটকাবাজি হবে কি না, পণ্যবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কমবে কি না; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই বলে দেয় ঘাটতি বাড়িয়ে এবং সুদের হার কর্তন করে ডলারকে অবমূল্যায়িত করা হবে কি না এবং গরিব দেশগুলোকে তাদের কৃষিক্ষেত্রের ওপর থেকে সহায়তা কমিয়ে আনার জন্যে বাধ্য করা হবে কি না। এটিও তাই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,- খাদ্যকে একটি মৌলিক অধিকার ধরে গরিবদের সেখানে প্রবেশাধিকার দেয়ার বদলে বাজার থেকে কিনতে বাধ্য করা হবে। অর্থাৎ প্রচলিত দৃষ্টিগ্রাহ্য ও প্রচারিত জনপ্রিয় সত্যের আড়ালে রয়েছে অন্যতর আরও এক নির্মম সত্য, আর তা হলো কর্পোরেটবাদীদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থেকেই বাড়ছে বাজারে পণ্যের মূল্য। রাষ্ট্রকাঠামো, সরকার, রাজনীতিক এবং অর্থনীতিবিদরা যে এরকম অর্থনৈতিক ফাটকাবাজী চালিয়ে যাওয়াকে অনুমোদন করছেন, সেটি রীতিমতো অপরাধ। রাজ প্যাটেল তা বলেছেন, কিন্তু তিনি যদি নাও বলতেন, তবুও তা নিঃসন্দেহে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবেই দেখা হতো। সময় নিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডামাথায় চিন্তাভাবনা করে এ-পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এ-পরিকল্পনার গোপন ও শান্ত অংশীদার। এমনকি বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যে সরকার আসবে তাকেও এ-পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে। না হলে সে-সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে অথবা যারা এ-পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন বা করবেন সে-রকম কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতাতেও আসতে দেয়া হবে না। বরং যারা এ-পরিকল্পনাটিকে সমর্থন করবেন, বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবেন, তাদের মধ্যেকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীটিকেই আগামীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে আসা হবে।
কোন মন্তব্য নেই »
কোন মন্তব্য নেই এখনও
মন্তব্য দিন
কালো রাতগুলি বৃষ্টিতে ভিজে শাদা
ইমতিয়ার শামীম
বাংলাদেশ
-
সাম্প্রতিক
- আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ
- বিদায় স্বায়ত্তশাসন ও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা?
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, তৃতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব
- শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার : সামান্য মুখবন্ধ
- বিধবা সময়ের গল্প
-
Links
-
আর্কাইভ
-
বিভাগ
-
RSS
Entries RSS
Comments RSS