বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
পাঁচ.
খাদ্যমূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের কর্পোরেটবাদী মিডিয়াগুলো ব্যাপারটির অপরিহার্যতা ও অনিবার্য ভয়াবহতা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশন করতে লাগলেন। কিছু দৈনিকের কর্পোরেট-কলামিস্টরা এ ব্যাপারে তাদের কলমের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন (হয়তো তাদের অনেকের আন্তরিকতাও আছে, হয়তো তারা বলিভিয়ার প্রক্রিয়াকেই সংকট থেকে উত্তরণের সঠিক প্রক্রিয়া মনে করেন!)। কর্পোরেট কলামিস্টদের কারও কারও মতে, উপদেষ্টা পরিষদের কেউ আসলে ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি। কিন্তু না, তারা ব্যাপারটি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। অর্থনীতির ছাত্র ফখরুদ্দিন আহমদ, এবি মীর্জ্জা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম আর হোসেন জিল্লুর রহমানদের যদি আমরা অবোধ ও নির্বোধ মনে করি, তা হলে তা হবে এ জগতের চিরকালীন সেরা কৌতূক। বরং পরিস্থিতি যাতে ভালোমতো তালগোল পাকায় সে জন্যেই সরকারের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের খাদ্যমজুত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ভারত থেকে চাল আমদানির ব্যাপারে সঠিক সময়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ ছিলেন এবং শুধু তাই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় যে-চাল এসেছিল পাকিস্তান থেকে তা ভালো হওয়ার পরও খারাপ বলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছিল।
এসব কিছুরই তত্ত্বাবধান করছেন আমাদের দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত, ঝানু ও দক্ষ অর্থনীতিবিদরা। আর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। এখন যে আবার মাটির নিচ থেকে চাল তুলে আনা হচ্ছে তারও হয়তো কারণ আছে। হয়তো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন কর্পোরেটবাদীদের।
এতে কোনও সন্দেহ নেই, মধ্যনব্বইতে বলিভিয়াতে যে শক থেরাপী বাজার কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, তারই খেলা চলছে বর্তমানে বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের পর এখানে রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানদের মতো অর্থনীতিবিদরা যে-ধরনের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা এখন একেবারেই সুদূরপরাহত। যদিও ফখরুদ্দিন আহমদ, হোসেন জিল্লুর রহমানরা উপদেষ্টা বনে যাওয়ার পর গুরুদক্ষিণা দিয়েছেন, রেহমান সোবহানকে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পদক ২০০৮ দিয়েছেন, কিন্তু তা আসলে নেহাৎই কৃতজ্ঞতাবশত,- কেননা এদের কেউই আর রেহমান সোবহানের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন না। সাশ যেমন কেইন্সের ভক্ত হওয়ার পরও কেইন্সকে পায়ে দলে এগিয়ে গেছেন, এরাও তেমনি রেহমান সোবহানের ছাত্র হওয়ার পরও রেহমান সোবহানের ধারণাগুলো অগ্রাহ্য করে চলেছেন। এখনও আমাদের সংবিধান বলছে, পরিকল্পিত অর্থনীতি অনুযায়ী দেশ চালানোর কথা (বোধহয় সংবিধানসংশোধনকারী রাজনৈতিক সরকারগুলো এ ব্যাপারটিকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন নি), কিন্তু সরকার বলছে বাজার মৌলবাদের কথা, মুক্ত বাজারের কথা।
এবং তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর থেকেই আমরা দেখছি, মধ্যনব্বইতে বলিভিয়ায় যে ব্যর্থ বাজারকৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, বাংলাদেশেও সেই বাজার কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। জাতীয়করণকৃত পাটশিল্পগুলি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে সেগুলি ব্যক্তিমালিকানায় পুনরায় চালু করার। দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে অব্যাহতগতিতে,- যদিও কর্পোরেটপন্থী মিডিয়াগুলি বারবার জনঅসন্তোষ স্তিমিত করার জন্যে অদ্ভূত সব প্রতিবেদন প্রচার করেছেন, কখনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলোকে দোষারোপ করেছেন, কখনো উপদেষ্টাদের অজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাবের সমালোচনা করেছেন; কিন্তু সবসময়েই আড়ালে রেখেছেন এ দেশীয় শক থেরাপীর প্রণেতা অর্থনীতিবিদদের। জ্বালানিতেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছিল গত এপ্রিল ২০০৭-এ আর সবশেষে সিএনজির মূল্য একলাফে দ্বিগুণ করা হয়েছে এপ্রিল ২০০৮-এ। ১০ এপ্রিল ২০০৮-এ অর্থ উপদেষ্টা এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিদেশ থেকে ফিরেই ঘোষণা দিয়েছেন, আবারও তিনি বাড়াবেন জ্বালানিতেলের দাম। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যমূল্য হু হু করে বেড়েছে আরেক দফা। এসবই শক থেরাপী। আপনি তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠবেন, কিন্তু বুঝতেও পারবেন না এটি আসলে যন্ত্রণা কি না; এবং তারপর হঠাৎ নিথর হয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। একটু পর জেগে উঠবেন, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কী হচ্ছে বোঝার আগে আবারও তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে বোধহীন হয়ে পড়বেন।
কর্পোরেটবাদীরা ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল খাত কৃষি এবং সেটিকেই তাদের টার্গেট করা দরকার। দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটানোর নামে আগে থেকেই এখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা চুক্তিভিত্তিক কৃষি শুরু হয়েছিল। এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার উদ্যোগ নিয়েছেন এটিকে আরও উৎসাহিত করার। আগামী ২০০৮-০৯ সালের বাজেটে চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে সরকারের। এই সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে কর অবকাশ সুবিধা, কমসুদে ব্যাংক ঋণসহ বীমা সুবিধা দেয়া ইত্যাদি। যেসব সুবিধা তারা কৃষককে দিতে নারাজ সেইসব সুবিধা ফার্মিং কোম্পানিকে দিতে সরকারের কোনও কুণ্ঠা নেই। যেমন, কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ছে। তবে এমন কৌশল খাটানো হচ্ছে, যার ফলে কৃষি ভর্তুকি পাবে মূলত কন্ট্রাক ফার্মগুলি। কৃষকরা ভর্তুকি পাক বা না-পাক কিছু আসে যায় না, কিন্তু এসব ফার্মকে ভর্তুকি দিতেই হবে।
কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর পরিকল্পনা নিয়ে যারা এগিয়ে আসছে, সেসব ফার্মিং কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বহুল আলোচিত ব্র্যাক। রয়েছে সুপ্রিম সীড। রয়েছে আগোরা। রয়েছে মীনাবাজার। আরও রয়েছে এনসিসি ব্যাংক ও বোম্বে সুইটস অ্যান্ড চানাচুর। এদের মধ্যে ব্র্যাক বীজের ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করছে এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্র্যাকের কৃষিচিন্তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। কিন্তু সরকারের কাছে এসব প্রশ্ন মোটেও বড় নয়। বড় হলো কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর মধ্যে দিয়ে সাশ-কথিত কাঠামোগত সহায়তা দেয়ার পথটি প্রশস্ত করা। কৃষক ¯^vaxb থাকবে কি না তা বড় ব্যাপার নয়, বড় ব্যাপার হলো কৃষককে নতুন করে দাস বানানো। মানুষ মারা যাবে নাকি বেঁচে থাকবে সেটি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। মানুষের পকেটে টাকা থাকবে কি থাকবে না সেটি চিন্তার ব্যাপার নয়, চিন্তার ব্যাপার হলো মুদ্রাস্ফীতি কমানো।
ছয়.
গত এক বছর ধরে শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে যে শক থেরাপী প্রয়োগ করে আসছেন, তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা সামান্য একটু ধারণা পেতে পারি সমপ্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তুলে ধরা কিছু তথ্য থেকে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বা শক থেরাপী বাজারকৌশল প্রয়োগ করার আগে এখানে ছয় কোটি গরীব মানুষ ছিল, যাদের মধ্যে হতদরিদ্র ছিল সাড়ে চার কোটি মানুষ। মাত্র এক বছরের মধ্যে এই সরকারের কল্যাণে মধ্যআয়ের শ্রেণীপরিধি সংকুচিত হয়েছে; গরিব মানুষের তালিকায় নেমে এসেছেন সেখান থেকে চার কোটি মানুষ। এখন তাই এখানে গরিব মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি আর এদের মধ্যে হতদরিদ্র মানুষ হলেন ছয় কোটি। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সহসভাপতি সাবেক কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল সৈয়দ ইউসুফের এই গবেষণাপ্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত ১৫ মাসে বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। অথচ মানুষের আয় বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ৭০ শতাংশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। উন্নত দেশগুলির অধিবাসীরা নিত্যপণ্য কিনতে ব্যয় করেন তাদের আয়ের আট শতাংশ। আর বাংলাদেশের এই দরিদ্র মানুষজনকে তাদের মোট আয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যয় করতে হয় নিত্যপণ্য কিনতে। এদের প্রকৃত আয় গত একবছরে কমেছে ৪৫ শতাংশ। এই মানুষরা কাপড়চোপড় কিনবে কোত্থেকে? মাথা গোঁজার ঠাঁই তুলবে কোত্থেকে? সন্তানকে স্কুলে পাঠাবে কেমন করে?
তারপরও গার্মেন্টসের শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করে, তখন তার মধ্যে আমরা বিদেশীদের চক্রান্ত দেখি। সাধারণ মানুষ যখন ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়েছে দেখে আশায় বুক বাধে আর ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে শামিল হয় তখন আমরা তাতে সরকারকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র দেখি। মিডিয়ার লোকজনকে দেখি এই সরকারের ওকালতি করে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও কলাম লিখতে। আমাদের কি কোনও লজ্জাই নেই?
সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে কোনও দুর্ভিক্ষ নেই, বড় জোর হিডেন হাঙ্গার রয়েছে। তা হিডেন হাঙ্গারই বটে। সরকার তো রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। কী করে এই দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষরা জানাবে তাদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধার কথা? সরকার তো মিডিয়ার ওপর খবরদারি করছেন, স্তাবকদের লেলিয়ে দিয়েছেন শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুণগান গাইতে। কে তুলে ধরবে এই দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষদের ক্ষুধার কথা?
আর কেইবা তুলে ধরবে এই কর্পোরেটবাদীদের নগ্নক্ষুধার নগ্নতা? বলিভিয়ার যে সর্বনাশা শক থেরাপীর কথা লিখেছি, সে সম্পর্কে বলিভিয়ার জনগণ সর্বপ্রথম জানতে পারে আগস্ট ২০০৫ সালে, সেখানকার সাংবাদিক সুসান ভেলাসকো পোরটিল্লো অনেক অনুসন্ধান চালিয়ে গনির অর্থনৈতিক টিমের সদস্যদের সাক্ষাৎকার আদায় করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাঁড় করানোর পর। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এখানকার বড় বড় মিডিয়াভবনগুলি কর্পোরেটপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে; এখানকার নামকরা কলামিস্টরা আসলে কর্পোরেট-কলামিস্ট। তারা অনেক কড়া কথা লিখতে পারেন, কিন্তু সেই কথা কথার কড়া কলাম কখন ছাপা হবে তা নির্ভর করে কর্পোরেটচক্রের ওপরে।
সুসানের মতো একজন সাংবাদিকের দেখা আমরা কতদিনে পাব! তার প্রতিবেদনটি ছাপানোর মতো একটি পত্রিকা আমরা কতদিনে পাব? কতদিন পর কত অনাহার ও মৃত্যুর বিনিময়ে, কত গৃহহীনতা ও অধিকারহীনতার বিনিময়ে আমরা মেটাতে পারব কর্পোরেটবাদীদের এই নগ্নক্ষুধা!?
তথ্যসূত্র :
এ কে গুপ্ত : মার্কেট ম্যাডনেস, জি-ম্যাগাজিন, জুন ২০০৮ সংখ্যা।
নাওমি ক্লেইন : দ্য শক ডকট্রিন, অ্যালেন লেন, ইংল্যান্ড, ২০০৭।
রাজ প্যাটেল : স্টাফড অ্যান্ড স্টার্ভড : দ্য হিডেন ব্যাটল ফর দি ওয়ার্ল্ড ফুড সিস্টেইম, যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৮।
কোন মন্তব্য নেই এখনও
মন্তব্য দিন
-
সাম্প্রতিক
- আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ
- বিদায় স্বায়ত্তশাসন ও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা?
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, শেষ পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, তৃতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পর্ব
- বাজারের ক্ষুধা : বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ, প্রথম পর্ব
- শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার : সামান্য মুখবন্ধ
- বিধবা সময়ের গল্প
-
Links
-
আর্কাইভ
- জুলাই 2008 (2)
- জুন 2008 (4)
- মে 2008 (2)
-
বিভাগ
-
RSS
Entries RSS
Comments RSS